কুবিতে ‘থাপ্পড় কাণ্ড’: তদন্ত চলাকালীন অভিযুক্ত শিক্ষককে শিক্ষা ছুটি
বাবলু দেব,কুবি প্রতিনিধি:
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে সহকর্মীকে 'থাপ্পড় কাণ্ডে' অভিযুক্ত শিক্ষককে তদন্ত চলাকালীন শিক্ষা ছুটি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তদন্তকে প্রভাবিত করতেই প্রশাসনের এমন দ্বিচারিতামূলক সিদ্ধান্ত বলে জানান 'ভুক্তভোগী' শিক্ষক। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, বিদেশি ডিগ্রি বিবেচনায় নিয়ম মেনেই ছুটি অনুমোদন করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২০২৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর আইন বিভাগের ১২১ তম অ্যাকাডেমিক মিটিংয়ে কোর্স বিতরণ নিয়ে বাগ্বিতণ্ডা জড়িয়ে পড়েন সহকারী অধ্যাপক মো. আবু বকর ছিদ্দিক এবং আলী মোর্শেদ কাজেম। বাগবিতণ্ডা এক পর্যায়ে অভিযুক্ত আলী মোর্শেদ কাজেম ঔদ্ধত্য হয়ে আবু বকর ছিদ্দিককে থাপ্পড় মারেন।
এ ঘটনার দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে একাধিক অভিযোগ জমা পড়লেও চলতি বছরের ৯ই ফেব্রুয়ারি আবু বকর ছিদ্দিক পুনরায় অভিযোগ জমা দিলে প্রশাসন বিষয়টি আমলে নেয়। এর ভিত্তিতে সম্প্রতি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সৈয়দুর রহমানকে আহ্বায়ক, সহকারী রেজিস্ট্রার মনির উজ্জামানকে সদস্যসচিব এবং গণিত বিভাগের অধ্যাপক ও প্রক্টর ড. মো. আবদুল হাকিমকে সদস্য করা হয়। তবে তদন্ত কমিটি গঠনের কয়েক কার্যদিবসের মধ্যেই অভিযুক্ত শিক্ষক আলী মোর্শেদ কাজেমকে শিক্ষা ছুটি দেয় প্রশাসন।
শিক্ষাছুটি দেওয়া প্রসঙ্গেও বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। ছুটির জন্য আবেদন করা তিন শিক্ষকের মধ্যে ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত দুজনই আবেদন করেছিলেন। এরমধ্যে এবছরের ১লা মার্চ আইন বিভাগের তিন শিক্ষকের ছুটির আবেদন ও শিক্ষক সংকটের বিষয়টি উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কাছে মতামত চায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু পরে সেই মতামতের অপেক্ষা না করেই গত ১২ এপ্রিল অভিযুক্ত শিক্ষক আলী মোর্শেদ কাজেমের ছুটি অনুমোদন করে প্রশাসন। অন্যদিকে আবু বকর সিদ্দিকের আবেদন মঞ্জুর করা হয়নি।
পরবর্তীতে ১৩ এপ্রিল আবারো ইউজিসিকে একটি চিঠি পাঠানো হয়। সেখানে নৃবিজ্ঞান এবং আইন বিভাগে শিক্ষক পদের অনুমোদন চাওয়া হয়। তবে চিঠিতে আইন বিভাগের ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয় যে, তিনজন শিক্ষক ছুটির আবেদন করেছেন। কিন্তু আবেদনকৃত তিনজনের একজন আলী মুর্শেদ কাজেমকে পূর্বেই ছুটি দেওয়া হলেও চিঠিতে সেটি উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ তুলেছেন 'ভুক্তভোগী' শিক্ষক।
এবিষয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিক (মাসুম) বলেন, 'তিনি গত ২২ ফেব্রুয়ারি রেজিস্ট্রার দপ্তরে শিক্ষা ছুটির জন্য আবেদন করেন। আবেদনটি অনুমোদনের জন্য তিন দিন সময় নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা মঞ্জুর হয়নি। তাকে জানানো হয়, তার আগে আরও দুজন আবেদন করেছেন। তবে বিভাগীয় পরিকল্পনা কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি এমন কোনো তথ্য জানতেন না বলে দাবি করেন।'
তিনি আরও বলেন, 'ইউজিসির মতামত চাওয়া হলেও তা পাওয়ার আগেই অভিযুক্ত শিক্ষককে ছুটি দেওয়া হয়। ১২ এপ্রিল ছুটি অনুমোদনের পরদিন আবার ইউজিসিকে চিঠি পাঠানো হয়, যেখানে তিনজন আবেদন করেছেন বলে উল্লেখ করা হলেও পূর্বে অনুমোদিত ছুটির বিষয়টি বলা হয়নি। তার মতে, এটি তথ্য গোপনের শামিল।'
তদন্ত প্রসঙ্গে আবু বকর সিদ্দিক বলেন, 'অভিযুক্ত শিক্ষককে ‘সেফ এক্সিট’ দেওয়ার লক্ষ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে তদন্ত প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।'
এবিষয়ে তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব মোঃ মনিরুজ্জামান বলেন, “আমি চিঠি পেয়েছি এবং এবিষয়ে আমরা কথা বলেছি। মিটিং এ বসে তদন্ত কার্যক্রমের পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো নেয়া হবে।”
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সৈয়দুর রহমানকে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, 'বিদেশি ডিগ্রি বিবেচনায় আলী মোর্শেদ কাজেমকে এক বছরের শিক্ষা ছুটি দেওয়া হয়েছে। আবু বকর সিদ্দিক ও তার স্ত্রী তারা দুজনে আইন বিভাগে কর্মরত শিক্ষক। তার স্ত্রী আগে ছুটির আবেদন করেছে এবং তাকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। এখন আমি যদি একই পরিবারের দুজনকে একসঙ্গে শিক্ষা ছুটি দিয়ে দিই, তাহলে বিভাগ পরিচালনায় সমস্যা হতে পারে।'
তিনি আরও বলেন, 'আবু বকর সিদ্দিকের পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তির শেষ সময়ের আগের দিন তার ছুটির আবেদনটি পরিকল্পনা কমিটির মাধ্যমে আমার কাছে আসে। সময়সীমার সীমাবদ্ধতার কারণে সেটি অনুমোদন করা সম্ভব হয়নি।'
তদন্তাধীন শিক্ষককে ছুটি দেওয়া তদন্তে প্রভাব ফেলতে পারে কি না এমন প্রশ্নে রেজিস্ট্রার বলেন, 'তদন্ত কমিটির সদস্যরা প্রয়োজনে অভিযুক্ত শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। এতে তদন্তে কোনো বিঘ্ন হবে না।'