মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সম্পাদকীয়

রাজনীতিতে তোষামোদি নয় বরং সমালোচনা থাকুক

Admin ২১ April ২০২৬ · Tuesday · ১২:১৩ অপরাহ্ণ
রাজনীতিতে তোষামোদি নয় বরং সমালোচনা থাকুক
রাজনীতিতে তোষামোদি নয় বরং সমালোচনা থাকুক

সমালোচনা ও তোষামোদে একদম বিপরীত বিষয় । দুটি কখনো একসাথে হয় না। সমালোচনা করলে তোষামোদি সম্ভব নয়। ঠিক একই ভাবে তোষামোদি করলে সমালোচনা সম্ভব নয়। ব্যক্তি হিসেবে সবাই চায় তোষামোদি, অন্যের কাছ থেকে নিজের প্রশংসা শুনতে। সে যেই ধরনের মানুষই হোক ; ভালো অথবা খারাপ। অপরদিকে সমালোচনা শুনতে খুব কম মানুষই চায়। জরিপ করলে দেখা যাবে অধিকাংশের বেশি মানুষই সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। কিন্তু বাস্তবতায় সমালোচনাই রাজনীতিকে শক্তিশালী করে এবং তোষামোদি করে দূর্বল।


সাধারণ ভাবে তোষামোদি বলতে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের অন্ধভাবে প্রশংসা করাকেই বোঝায়। যেখানে ব্যক্তির দোষ বা ভুল-ত্রুটি আড়াল করা হয় , অবৈধ বিষয়কে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, সত্যকে আড়াল করা হয় এবং ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এটি সমাজ,দেশ ও জনগণ সবার ক্ষতি করে। দেশের বাস্তব প্রেক্ষাপটে তোষামোদি এখন রাজনীতিতে 'রাজনৈতিক সংস্কৃতি' হিসেবে পরিণত হয়েছে। সবাই নিজেদের ব্যক্তিগত সুবিধা ভোগের জন্য নেতাদের দোষ-ত্রুটিকে প্রশংসনীয় কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। তবে এই তোষামোদি কখনোই সমাজ ও দেশের জন্য কল্যাণ আনতে পারে না। বরং ভয়াবহ অবস্থা তৈরি করে। যেমন - তোষামোদি করার জন্য যখন সত্য কিছু আড়াল করা হয়, তখন রাজনৈতিক নেতারা দেশের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অন্ধকারে থাকেন। দোষ ত্রুটিকে সঠিক হিসেবে উপস্থাপন না করায় সংশোধন হওয়ার উপায় থাকে না। অবৈধ বিষয়কে বৈধতা দেওয়ায় জনগণের চাহিদা এবং করণীয় সম্পর্কে নেতারা বুঝতেই পারে না। ফলে জনগণ ক্ষিপ্র হয়। তোষামোদিতে ব্যক্তি স্বার্থরক্ষার ফলে জাতীয় স্বার্থ তলানিতে চলে যায়। এছাড়া দূর্নীতি বাড়ে। সবাই সবার নিজেদের মতো করে চলে। ফলে জবাবদিহিতা থাকে না। মেধার অবমূল্যায়ন হয়। যোগ্য ব্যক্তি যোগ্য জায়গায় যেতে পারে না। যোগ্যতা মূল্যায়নে দূর্নীতি ও চাটুকারিতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। দেশের গনতন্ত্র দূর্বল হয়। বিরোধী দল সমালোচনা করার সুযোগ পায়না। কেউ সমালোচনা করলে তাকে শাস্তির আওতায় আনা হয়। ফলে দেশে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সহজ হয়। যার বাস্তব উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়- আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারকে। জনগণ থেকে  দেশের সমস্ত ক্ষমতা নিজের করায়ত্তে নিয়ে এসে দীর্ঘ ১৬ বছর ক্ষমতার মসনদে আসীন ছিলেন। ২০২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা পতনের অন্যতম কারণ এই তোষামোদি। সরকারের উচ্চ থেকে নিম্ন সকল পর্যায়ে নিজ দলের ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়েছেন। এই নিয়োগে যোগ্যতা দেখার বিষয় মনে করেনি। দূর্নীতি আর চাটুকারিতাকেই যোগ্যতা হিসেবে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে দেশের সকল পর্যায়ে অযোগ্য ব্যক্তি দিয়ে সয়লাব। এরা নিজেরা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দূর্নীতি ও সরকারের তোষামোদিকেই গুরুত্ব দিয়েছে এবং অধীনস্থদের কাছেও নিজের তোষামোদি আশা করে। এভাবেই চলছিল দেশ। সবাই শেখ হাসিনার অবৈধ কাজের বৈধতা প্রমাণ করে তোষামোদি করছে। সত্য ও বাস্তবতাকে আড়াল করেছে। ফলে তিনি বৈধ অবৈধ বুঝতে পারেননি। জনগণের ম্যান্ডেট বুঝতে পারেননি। এভাবে জনগণের পরিবর্তে নিজেই হয়ে উঠেছে সকল ক্ষমতার মালিক।  কেউ তোষামোদির পরিবর্তে সমালোচনা করলেই গ্রেফতার করা হতো। ফলে বিরোধী দলের সমালোচনা করার সুযোগ ছিল না। এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছেন ফ্যাসিস্ট। যার পরিণতি ২০২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছিল।

অন্যদিকে ব্যক্তির ভালো দিকের পাশাপাশি মন্দ দিকের গঠনমূলক আলোচনা করাই সমালোচনা।সাধারণত, মানুষ সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। গনতান্ত্রিক দেশে সমালোচনা ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ। সুস্থ সমালোচনাই গণতন্ত্রের অক্সিজেন। দেশে সমালোচনা থাকলে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।  চাইলেও নেতা বা আমলারা দূর্নীতি করতে পারবে না।  এছাড়া সমালোচনার মাধ্যমে সরকার নিজের দোষ ত্রুটি সম্পর্কে জানতে পারে। ফলে সংশোধন হওয়ার উপায় থাকে। রাজনৈতিক দলের নেতাদের এবং বিভিন্ন নিয়োগে দূর্নীতির সুযোগ থাকে না। দেশ হয় দূর্নীতি ও চাটুকার মুক্ত। ফলে জনগণের ক্ষমতা জনগণের হাতেই থাকে।  সরকার ফ্যাসিস্ট হওয়ার সুযোগ পায় না। এছাড়া দেশে সহজেই জনমত গঠন হয়। আলোচনা সমালোচনা থেকেই জনগণ সচেতন হয় এবং জাতীয় স্বার্থে ব্যক্তিস্বার্থকে উপেক্ষা করে যেকোনো বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এছাড়া ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে। ক্ষমতার ভারসাম্যে মন্টেস্কু থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সবাই একমত যে, ক্ষমতার বিপরীতে প্রতিষ্ঠান ও সমালোচনা থাকা চাই।


বাংলাদেশ একটি গনতান্ত্রিক দেশ। গণতন্ত্র মানে জনগণের শাসন। অর্থাৎ যে দেশের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ, তাই গনতান্ত্রিক দেশ। একটি গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সকল ক্ষমতার  উৎস জনগণ। জনগণের ভোটের মাধ্যমেই দেশের সরকার ও বিরোধী দল নির্বাচিত হয়। গনতান্ত্রিক দেশে সরকারদলের দায়িত্ব সার্বিক ভাবে দেশ ও দেশের মানুষের জীবনমানের উন্নতি করা এবং দেশ পরিচালনা করা। বিরোধীদলের অন্যতম কাজ সরকারদলের গঠনমূলক সমালোচনা করে দেশকে এগিয়ে নেওয়া।  এভাবেই গণতান্ত্রিক দেশে বজায় থাকে জনগণের অংশগ্রহণ, সমতা, সহনশীলতা, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, সুষ্ঠু নির্বাচন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার, মানবাধিকার এবং আইনের শাসন । মূলত এগুলো বিষয়ের উপর ভিত্তি করেই দেশে গণতন্ত্র পূর্ণতা পায়।

আর গনতান্ত্রিক দেশের মূল শক্তি রাজনৈতিক দল। গণতান্ত্রিক দেশে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক দল থাকবে। একেক দলের একেক আদর্শ, একেক বিধিবিধান থাকে। তবে সমস্ত দলের কমন বিষয় দেশ ও জনগণের জীবনমানের উন্নতি করা। এটাই একেক দল একেক ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সেই জায়গা থেকে নিজেদের আদর্শ ও বিধান বাস্তবায়নে দরকার জবাবদিহিতা ও সমালোচনা।


দলের রাজনীতি করার স্বার্থে সবকিছুর বৈধতা দিতে নাই। জোর করে অযৌক্তিক বিষয়কে যৌক্তিক বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। কোনো বিষয়ে সাধারণ জনগণ বলছে ঠিক না। সেটাকে কেন ঠিক প্রমাণ করতে হবে? নেতার কাছে সামান্য  প্রাধান্য পাওয়ার জন্য! যখন একটা বেঠিক বা অবৈধ বিষয়কে ঠিক বা বৈধ প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন অযৌক্তিক বিষয়কেও যৌক্তিক মনে করা হচ্ছে , ঠিক তখনই ভাবনায় থাকা দরকার এই বিষয়টিকে কত শতাংশ মানুষ বৈধতা দিচ্ছে?  কিন্তু বর্তমান রাজনীতিতে মানুষকে বিবেচনাই করা হয় না। ক্ষমতা যেদিকে, সবকিছু সেই দিকে। আওয়ামী লীগের আমলে এরকম দেখা যেত। যার ফলে পতন হয়েছে। এরপর অন্তবর্তী সরকার গঠন হয়েছে। আঠারো মাস পর সেই সরকার একটি অবাধ ও সুষ্ঠু অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করেছে। দেশের সকল মানুষ আনন্দ আমেজের সাথে ভোট প্রদান করে মনোনীত দলকে নির্বাচিত করেছে। দেশের মানুষের দুই তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি সরকার গঠন করে এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিরোধী দল হিসেবে সংসদে যায়। নির্বাচিত সরকারের দুই মাস চলছে। এই সময়ের মধ্যেই আওয়ামী সরকারের তোষামোদির রাজনীতি এখনও দেখা যাচ্ছে। বেঠিক কাজকে ঠিক প্রমাণ করার জন্য উঠে পরে লাগছে দলীয় লোকজন। যেভাবেই হোক সঠিক প্রমাণ করতেই হবে। সঠিক সিদ্ধান্ত প্রমাণ করতেই হবে। আর সবখানে নিজ দলীয় লোকদের নিয়োগ। একপর্যায়ে এরাও সরকারের ভুল ঠিক না বুঝে সকল অবৈধ বা ভুল কাজের বৈধতা প্রমাণ করে তোষামোদি শুরু করবে। ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে।তবে এর ভবিষ্যৎ ভালো না। দেশের মানুষ পূর্বের থেকে রাজনীতি থেকে শুরু করে সকল বিষয়ে সচেতন হয়েছে। এ জন্য সরকারদল ও বিরোধীদলের সবকিছু নিরপেক্ষতার জায়গা থেকে দেখতে হবে। জনগণকে আলোচনা, সমালোচনা সুযোগ দিতে হবে এবং তা গ্রহণ করতে হবে। দলকানা বা দলান্ধ হয়ে দলের সবকিছুর বৈধতা দিতে নেই। সকল বিষয়ে দলের সব সিদ্ধান্ত সঠিক হয় না,  ভুলও হয়। সেই ভুলটার সমালোচনা করা শিখতে হবে । ভুলকে সঠিক হিসেবে প্রমাণ করার জন্য অযৌক্তিক যুক্তিকে দাঁড় করিয়ে জনগণের বিপরীত অবস্থানে যাওয়া মানেই দলের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করা। এজন্য সমস্ত রাজনৈতিক দলের উচিত দেশের জনগণের ম্যান্ডেট বুঝা এবং সেই অনুযায়ী দেশ পরিচালনা করা।


মোজাহিদ হোসেন 
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া। 
ইমেইল : mojahidhosen5913@gmail.com

মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

আরও পড়ুন

নিকলীতে বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বর্ণাঢ্য র‍্যালী

নিকলীতে বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বর্ণাঢ্য র‍্যালী

নিকলী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক...

০১ September ২০২৬ · Tuesday · ০১:২০ অপরাহ্ণ
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রামপুরে সৌদি প্রাসীর বাড়িতে ডাকাতি, আটক ৩

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার রামপুরে সৌদি প্রাসীর বাড়িতে ডাকাতি, আটক ৩

নোয়াখালী প্রতিনিধি: কোম্পানীগঞ্জে সৌদি প্রবাসীর বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় সন...

৩১ August ২০২৬ · Monday · ০৯:০৯ অপরাহ্ণ
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে ডিবি পরিচয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাকে গাড়িতে তুলে ১২ লাখ টাকা ছিনতাই

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে ডিবি পরিচয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাকে গাড়িতে তুলে ১২ লাখ টাকা ছিনতাই

নোয়াখালী প্রতিনিধি: নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে ডিবি পুলিশের পরিচয় দিয়ে একটি বেসরকারি ব্য...

৩১ August ২০২৬ · Monday · ০৯:০৭ অপরাহ্ণ
বিএনপি-এনসিপি-সাংবাদিকের নামে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে সংবাদ সম্মেলন

বিএনপি-এনসিপি-সাংবাদিকের নামে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবীতে সংবাদ সম্মেলন

নিজস্ব প্রতিবেদক:কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের একটি ঝটিকা মিছিলকে কেন্দ্র ক...

৩১ August ২০২৬ · Monday · ০৯:০৬ অপরাহ্ণ