শিশুরা কেন ঘর ছাড়ে? কারণ খুঁজে প্রতিরোধের সময় এখনই
এ.কে.এম আজিজুর রহমান:
গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের এই প্রশ্ন যেন আজও আমাদের সমাজের দিকে ছুড়ে দেওয়া। বিশেষ করে সেইসব শিশুর দিকে, যাদের ছোট ছোট স্বপ্ন, অভিমান ও কষ্টের খবর আমরা অনেক সময় রাখি না।
বেশ উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, শিশুদের পরিবার ও নিরাপদ পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এ ৪ লাখ ২৫ হাজার ৬৫১টি কল এসেছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৫৪ হাজারের বেশি কল ছিল শিশু নির্যাতন, শোষণ ও মানসিক সহায়তা নিয়ে। বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে ৩৩ হাজার ৭২ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। এই সংখ্যা সরাসরি ঘর থেকে পালিয়ে যাওয়া শিশুর নয়; তবে শিশু সুরক্ষার বাস্তবতা নিয়ে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।
একটি শিশু সাধারণত হঠাৎ ঘর ছাড়ে না। পারিবারিক অশান্তি, দারিদ্র্য, অবহেলা, অতিরিক্ত শাসন, নির্যাতন, পড়াশোনার চাপ, একাকিত্ব কিংবা নিরাপত্তাহীনতা তাকে ধীরে ধীরে ঘরছাড়া করতে পারে। তাই প্রশ্ন শুধু—শিশুটি কোথায় গেল? বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—সে কেন যেতে চাইল?
অভাব-অনটনে থাকা পরিবারগুলোর সমস্যাটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যে পরিবার খাবার, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার খরচ জোগাতে হিমশিম খায়, সেখানে শিশুর ওপরও চাপ পড়ে। তাই শিশুকে সুরক্ষিত রাখতে হলে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকেও সামাজিক নিরাপত্তার বেষ্টনীর আওতায় আনতে হবে। শিক্ষা সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য সহায়তা ও জীবিকার সুযোগের সঙ্গে পরিবারকে যুক্ত করা জরুরি।
এ কাজটি শুরু হতে পারে ইউনিয়ন পর্যায় থেকে। প্রতিটি ইউনিয়নে কার্যকর শিশু সুরক্ষা কমিটি গঠন বা সক্রিয় করা যেতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদ, সমাজসেবা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা এবং শিশু নিয়ে কাজ করা NGO-কে সমন্বিতভাবে যুক্ত করে ঝুঁকিপূর্ণ শিশু ও পরিবার চিহ্নিত করা যেতে পারে। প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন শিশু সুরক্ষা ফোকাল ব্যক্তি থাকলে সমস্যার আগাম সংকেত পাওয়া আরও সহজ হবে।
কোনো শিশু হঠাৎ স্কুলে যাওয়া বন্ধ করলে, কাজে যুক্ত হলে, আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে কিংবা বারবার পালিয়ে যাওয়ার কথা বললে তাকে অবাধ্য না ভেবে তার কথা শুনতে হবে।
কারণ শিশুর আচরণ অনেক সময় তার না-বলা কথার ভাষা।
নিখোঁজের পর দ্রুত উদ্ধারে ২০২৬ সালে MUN Alert ও ২৪ ঘণ্টার ১৩২১৯ হেল্পলাইন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য শুধু শিশু হারিয়ে গেলে তাকে খুঁজে বের করা নয়; শিশু যেন হারিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় না পৌঁছায়, সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
তাই আজ কবির সেই প্রশ্ন আবারও সামনে আসে
“কে রাখে খবর তার?”
এই খবর রাখতে হবে পরিবারকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে, সমাজকে, স্থানীয় সরকারকে এবং রাষ্ট্রকে।
শিশুকে ভয় নয়—বিশ্বাস দিন।
পরিবারকে দোষ নয়—সহায়তা দিন।
শিশু হারিয়ে যাওয়ার পর নয়—হারিয়ে যাওয়ার আগেই তার পাশে দাঁড়ান।
কারণ একটি শিশুকে উদ্ধার করা জরুরি; কিন্তু তার চেয়েও জরুরি—এমন সমাজ গড়া, যেখান থেকে কোনো শিশুকে ঘর ছাড়তে না হয়।
এ.কে.এম আজিজুর রহমান
উন্নয়নকর্মী ও কলাম লেখক