সরকারি নির্দেশ অমান্য করে স্কুল মাঠে গরুর হাট
কিশোরগঞ্জ ও নিকলী প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের নিকলীতে প্রায় ১৪ বছর ধরে সরকারি নির্দেশ অমান্য করে উপজেলার জারইতলা ইউনিয়নের সাজনপুর গ্রামের আঠারোবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে বসছে গরু-ছাগলের হাট। বিদ্যালয় চলাকালেই সপ্তাহের বুধবার মাঠ ও সড়ক দখল করে এই হাট বসে। এতে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকে শিক্ষার্থীরা, অপরদিকে পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া মাঠ নষ্ট হওয়ায় নিয়মিত খেলাধূলা করতে পারছে না শিক্ষার্থীরা।
বুধবার (২৬ আগস্ট) দুপুরে ওই বিদ্যালয়ের মাঠে গিয়ে দেখা যায় এমন চিত্র।
সরেজমিন গিয়ে জানা গেছে, জেলার গরু-ছাগলের বড় হাটের একটি জারইতলা ইউনিয়নের এই গোপীরায়ের হাট। হাটের দিন বিভিন্ন উপজেলার পাশাপাশি আশপাশের জেলা-উপজেলা থেকেও ট্রাক, পিকআপ, ভটভটিতে গরু ও ছাগল বিক্রির জন্য আনা হয়। এসব গাড়ি পাশের রাস্তার ওপর দাঁড় করে রাখা হয়।
এতে বুধবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নিকলী থেকে বাজিতপুর, ভৈরব, কটিয়াদি যাওয়ার একাধিক সড়ক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ফলে কিশোরগঞ্জ জেলা সদর ও নিকলী উপজেলা সদরে যাতায়াত,পার্শ্ববর্তী বাজিতপুর উপজেলার জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল ও জেলা সদরের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা-যাওয়ার রোগীবাহী গাড়ি চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি হয়। এলাকাবাসী জানায়, গোপীরায়ের বাজারের নামে হাটটি ইজারা দেয়া হয়। কিন্তু বাজারে জায়গা না থাকায় প্রতি সপ্তাহের বুধবার আঠারোবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠেই হাটটি বসে। হাটের দিন স্থানীয়া কৃষকের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা গরু নিয়ে হাটে আসেন।নিকলী উপজেলা প্রশাসন একাধিকবার এ হাট বন্ধে অভিযান পরিচালনা করে ও স্কুল মাঠের ভিতর গরুর বাজার নিষিদ্ধ করে সাইনবোর্ড স্থাপন করে।
কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে স্কুল মাঠের ভিতর গরুর বাজার বন্ধে সাইনবোর্ডটিও খুজে পাওয়া যায় নি।
বিদ্যালয়ের সাবেক একাধিক শিক্ষার্থী নাম না প্রকাশের শর্তে জানিয়েছেন, ২০০৯ সাল থেকে বিদ্যালয়ের মাঠে পশুর হাট বসানো হচ্ছে। তারপর থেকে বিদ্যালয়টিতে কেউ মেধাবৃত্তি পায়নি। তার আগে পেয়েছে।হাট বসানোর পর থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কমে গেছে বলে মনে করেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল রহিম বলেন, বিদ্যালয়ের পাশেই জারইতলা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) কমপ্লেক্স অবস্থিত। সেখানে একটি পশু চিকিৎসাকেন্দ্রসহ সরকারি বিভিন্ন কার্যালয়ের
সেবা দেয়া হয়। কিন্তু মাঠে হাট বসায় এসব সেবা ছাড়াও বুধবার ইউনিয়ন পরিষদের সেবা নিতে পারছেন না স্থানীয়রা।
এদিকে হাটের ইজারামূল্য নিয়েও রয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ১৪৩২ বঙ্গাব্দে হাটটির ইজারামূল্য ছিল ৩ কোটি ৭৫ লাখ ৫০ হাজার ৮০০ টাকা। অথচ চলতি ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে একই হাটের ইজারা পেয়েছেন আওয়ামীলীগ আমলে সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশিদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত বর্তমানে বিএনপি ঘনিষ্ঠ মোকাররম সর্দার, মাত্র ১ কোটি ২৫ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ইজারামূল্য কমেছে আড়াই কোটিরও বেশি টাকা।এ নিয়ে জেলাজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হলেও কীভাবে এত কম মূল্যে হাটটির ইজারা দেওয়া হলো।
২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত গুপি রায়ের হাট বর্তমানে জেলার অন্যতম বৃহৎ পশুর হাট হিসেবে পরিচিত। প্রতি বুধবার বসা এই হাটে বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে ক্রেতা-বিক্রেতারা আসেন। ফলে প্রতিবছরই হাটটির আর্থিক গুরুত্ব বাড়ছিল। সে হিসেবে এবার ইজারামূল্য আরও বাড়বে বলেই ধারণা ছিল সবার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাধারণত এক বছরের তুলনায় পরের বছর ইজারামূল্য বাড়ে। কিন্তু এক্ষেত্রে হয়েছে উল্টো। প্রকৃত সম্ভাব্য আয় গোপন করে প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় কম মূল্যে হাটটি ইজারা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া তিনবার দরপত্র আহ্বানের বিধান থাকলেও প্রথম বিজ্ঞপ্তিতেই ইজারাদার চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
এ বিষয় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. আবু সিদ্দিক বলেন, গরুর হাট বসানো নিয়ে বাজার কমিটিকে বহুবার বলা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন তাদের দুইবার জরিমানাও করেছে। আমি এ ব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি।
স্কুল মাঠে গরুর হাট বসানোর বিষয় জানতে চাইলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) জেসমিন আক্তার বলেন, স্কুল মাঠে গরুর হাট বসানোর কোনো নির্দেশনা নেই। প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ দখল করে হাট বসালে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন জানান,বিদ্যালয়ের মাঠ দখল করে পশুর হাট বসানোর কোন অনুমতি দেয়া হয় নি।নিকলী উপজেলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এ ব্যাপারে যথাযথ দিক নির্দেশনা দেয়া হবে।যাতে স্কুল মাঠে পশুর হাট বসে শিক্ষার পরিবেশ নস্ট করতে না পারে সে ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হবে।