নলডাঙ্গার উন্নয়ন ও মানবিকতায় স্মরণীয় হয়ে থাকবেন ইউএনও আল এমরান খাঁন
নাটোর প্রতিনিধি:
নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলা থেকে সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় বদলি হয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল এমরান খাঁন। সরকারি চাকরির নিয়মিত বদলির অংশ হিসেবে দায়িত্ব ছাড়লেও স্বল্প সময়ের কর্মকালেই উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড, মানবিক উদ্যোগ, পরিবেশ সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা এবং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নলডাঙ্গাবাসীর হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।
দায়িত্ব পালনকালে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে নাগরিক সেবা সহজ ও জনবান্ধব করার চেষ্টা করেছেন আল এমরান খাঁন। উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে গড়ে তুলেছিলেন আন্তরিক সম্পর্ক। কোনো সমস্যা নিয়ে মানুষ তাঁর কাছে গেলে তা মনোযোগ দিয়ে শুনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতেন। ফলে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে নয়, একজন মানবিক, কর্মঠ ও জনবান্ধব ইউএনও হিসেবেই স্থানীয়দের কাছে পরিচিতি পান তিনি।
উন্নয়ন ও জনকল্যাণে সক্রিয় ভূমিকা
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আল এমরান খাঁনের দায়িত্বকালীন সময়ে নলডাঙ্গা উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সমন্বয় ও গতিশীলতা বাড়ে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির পাশাপাশি এলাকার সমস্যা সরেজমিনে পরিদর্শনের প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ আগ্রহ।
শুধু দাপ্তরিক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন তিনি। তাঁদের সমস্যা, সম্ভাবনা ও প্রত্যাশার কথা শুনতেন। স্থানীয় উন্নয়ন, শিক্ষা, পরিবেশ, কৃষি, খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়েও তাঁর নানা পরিকল্পনা ছিল।
কর্মকর্তাদের চোখে আল এমরান খাঁন
নলডাঙ্গা উপজেলা সমাজসেবা অফিসার সুমন সরকার বলেন, “স্যার দায়িত্বে থাকাকালে উপজেলার উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের কল্যাণে আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন। বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে তিনি অনেক ভালো উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছেন। তাঁর মতো একজন কর্মঠ ও আন্তরিক কর্মকর্তাকে বদলি হয়ে যেতে দেখে আমরা সত্যিই ব্যথিত।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সবুজ আলী বলেন, “আল এমরান খাঁন স্যার ছিলেন অত্যন্ত সহযোগিতাপরায়ণ একজন কর্মকর্তা। কৃষকসহ সাধারণ মানুষের সমস্যা গুরুত্ব দিয়ে শুনতেন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে তা সমাধানের চেষ্টা করতেন। সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি এলাকার উন্নয়ন নিয়েও তাঁর চিন্তা ছিল।”
শিক্ষক আব্দুর রহিম বলেন, “শিক্ষা, পরিবেশ ও সামাজিক নানা বিষয়ে ইউএনও সাহেবের আগ্রহ ছিল। তিনি তরুণদের নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি উপজেলার সামগ্রিক উন্নয়ন নিয়েও ভাবতেন। তাঁর কর্মপরিকল্পনার অনেক কিছু ভবিষ্যতে নলডাঙ্গার কাজে আসবে।”
ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আব্দুল্লাহ আল বাকি বিদায়ী ইউএনওর খেলাধুলা ও তরুণ সমাজকে মাদকমুক্ত রাখার ইতিবাচক উদ্যোগগুলোর প্রশংসা করেন।
সমাজসেবক ইউছিনুর রহমান বলেন, “স্যার ছিলেন একজন প্রচারবিমুখ মানুষ। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নলডাঙ্গায় বিভিন্ন উন্নয়ন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু নিজের কাজের প্রচার করতে কখনোই পছন্দ করতেন না। অনেক কাজ করেছেন নীরবে। মানুষ তাঁর কাজ মনে রাখবে।”
তিনি আরও বলেন, “সরকারি কর্মকর্তা বদলি হয়ে অন্যত্র যাবেন—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মানুষের ভালোবাসা নিয়ে বিদায় নেওয়া সবার ভাগ্যে হয় না। আল এমরান খাঁন সেই ভালোবাসা অর্জন করেছেন।”
সাধারণ মানুষের কাছেও ছিলেন আপনজন
আল এমরান খাঁনের বদলিতে নলডাঙ্গার বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষও হতাশা প্রকাশ করেছেন।
বাঁশিলা গ্রামের আহসান আলী বলেন, “ইউএনও স্যারকে আমরা সবসময় সাধারণ মানুষের কাছে পাওয়া একজন কর্মকর্তা হিসেবে দেখেছি। কোনো সমস্যা নিয়ে গেলে তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তাঁর মধ্যে মানুষের জন্য কিছু করার আন্তরিকতা ছিল।”
পাটুল এলাকার মহির উদ্দিন বলেন, “স্যার দায়িত্বে থাকাকালে এলাকায় বেশ কিছু পরিবর্তন চোখে পড়েছে। শুধু অফিসের কাজ নিয়ে বসে থাকতেন না, বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন এবং এলাকার সমস্যা দেখতেন। তাঁর বদলিতে আমরা একজন ভালো কর্মকর্তাকে হারালাম।”
বাসুদেবপুর এলাকার ৫৫ বছর বয়সী লতিফা বেওয়া বলেন, “আমাদের মতো অসহায় মানুষের কথাও তিনি শুনতেন। বড় কর্মকর্তা হয়েও সাধারণ মানুষের সঙ্গে খুব সহজভাবে কথা বলতেন। তাঁর ব্যবহার ছিল খুব ভালো। তিনি চলে যাওয়ায় আমাদের খারাপ লাগছে।”
উপজেলা পরিষদ চত্বরে সৌন্দর্যবর্ধন
স্থানীয়দের মতে, নলডাঙ্গা উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণের সৌন্দর্যবর্ধনেও আল এমরান খাঁনের বিশেষ আগ্রহ ছিল। উপজেলা পরিষদ চত্বরে ঝর্ণাধারা নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ ও বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানোর মাধ্যমে প্রশাসনিক কার্যালয় এলাকাকে আরও নান্দনিক করে তোলার উদ্যোগ নেন তিনি।
এ ছাড়া নলডাঙ্গা-নওগাঁ সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় সোনালুসহ দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণে উৎসাহ দেন। পরিবেশবান্ধব উপজেলা গড়ে তোলার পাশাপাশি সবুজায়নকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ারও চেষ্টা ছিল তাঁর।
হালতি বিলকে ঘিরে পর্যটনের স্বপ্ন
নলডাঙ্গার ঐতিহ্যবাহী হালতি বিলকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও ছিল আল এমরান খাঁনের অন্যতম আলোচিত উদ্যোগ। স্থানীয় পর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে হালতি বিলকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার বিষয়ে তিনি বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
স্থানীয়দের ধারণা, হালতি বিলকে ঘিরে তাঁর নেওয়া পরিকল্পনাগুলো ভবিষ্যতে বাস্তবায়িত হলে নলডাঙ্গার পর্যটন সম্ভাবনা আরও বিকশিত হতে পারে। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগও বাড়তে পারে।
প্রচারের আড়ালে কাজ করাই ছিল পছন্দ
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আল এমরান খাঁনের কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল প্রচারের চেয়ে বাস্তব কাজকে গুরুত্ব দেওয়া। অনেক কর্মকাণ্ডের প্রচার না করে নীরবে কাজ করতেই তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।
সাধারণ মানুষ, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ছিল তাঁর কাজের অন্যতম দিক। এ কারণে বদলির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে আবেগ ও হতাশা দেখা দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকে তাঁর কর্মকালীন উদ্যোগের প্রশংসা করে বিদায়ী শুভেচ্ছা জানান।
বিদায়বেলায় যা বললেন আল এমরান খাঁন
বিদায়বেলায় সদ্য বিদায়ী ইউএনও মো. আল এমরান খাঁন বলেন, “নলডাঙ্গায় দায়িত্ব পালনকালে আমি সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। এখানকার মানুষ, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছ থেকে যে সহযোগিতা পেয়েছি, তা সবসময় মনে থাকবে। নলডাঙ্গার মানুষের প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “সরকারি চাকরিতে বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। দায়িত্বের প্রয়োজনে আমাকে অন্যত্র যেতে হচ্ছে। তবে নলডাঙ্গার মানুষের ভালোবাসা ও আন্তরিকতা আমি সবসময় মনে রাখব। এখানকার উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে নেওয়া উদ্যোগগুলো ভবিষ্যতেও এগিয়ে যাবে—এটাই আমার প্রত্যাশা।”
চেয়ার ছেড়েছেন, রেখে গেছেন ভালোবাসা
সরকারি চাকরিতে বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। প্রশাসনিক প্রয়োজনেই একজন কর্মকর্তাকে এক উপজেলা থেকে অন্যত্র যেতে হয়। আল এমরান খাঁনের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে তাঁর কর্মকাল সীমিত হলেও সেই সময়ের মধ্যেই মানবিকতা, আন্তরিকতা ও জনকল্যাণের নানা উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি নলডাঙ্গাবাসীর মনে যে জায়গা করে নিয়েছেন, সেটিই তাঁকে স্মরণীয় করে তুলেছে।
স্থানীয়দের ভাষায়, সরকারি বদলির কারণে আল এমরান খাঁন নলডাঙ্গার চেয়ার ছেড়েছেন, কিন্তু মানুষের ভালোবাসার জায়গা থেকে তাঁকে কেউ সরাতে পারেনি। উন্নয়ন, মানবিকতা, পরিবেশ ও জনবান্ধব প্রশাসনের নানা উদ্যোগের স্মৃতি নিয়ে তিনি নলডাঙ্গা থেকে বিদায় নিয়েছেন। দায়িত্বের কারণে দূরে গেলেও তাঁর রেখে যাওয়া কাজ ও মানুষের ভালোবাসা দীর্ঘদিন নলডাঙ্গাবাসীর স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে।