রবীন্দ্রনাথের 'ডাকঘর' : মানবমুক্তির নিগূঢ় প্রেরণা
আমরা প্রত্যেকেই শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে কোনো না কোনোভাবে একপ্রকার রুদ্ধ জীবনযাপন করি। আমরা যখন শ্রেণীকক্ষে একটু বেশি সময় ধরে শিক্ষকের কথা শুনি, তখন বিরক্ত হই, আমাদের বাইরে যেতে মন চায়। আবার দীর্ঘদিন যাবৎ ক্যাম্পাসে পড়ালেখার চাপে একঘেয়ে জীবন থেকে ছুটি পেতে মন চায়। আমাদের সবারই তীব্র ইচ্ছা আছে বিদেশে ভ্রমণ করার। অনেক ধনবান ব্যক্তির আবার সারা পৃথিবী ঘুরেও ভালো লাগে না, তখন সে মহাকাশ ভ্রমণে যায়। অনেকে আবার জীবন থেকেই চিরতরে মুক্তি চায়।
অনেক মনীষী ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বলেছেন, আগে বাঙালির মানসিকতায় মুক্তি আসা জরুরি, তাহলেই ভৌগলিক ও অর্থনৈতিকভাবে মুক্তি মিলবে। কিন্তু, একটা প্রবন্ধে আমি পড়েছিলাম যে, আগে আমাদের বহিরঙ্গে মুক্ত হওয়া প্রয়োজন, তাহলেই আমাদের মানসিক মুক্তির প্রেরণা ও সুযোগ তৈরি হবে। কীভাবে আমরা জীবনে স্বাধীনতা ও শান্তি লাভ করতে পারি, কীভাবে মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশের চিরায়ত দুঃখ ঘোচানো যায়, কীভাবে একাকীত্ব থেকে মুক্তি লাভ করা যায়, অর্থনৈতিক ও আত্মিক মুক্তির সেই সহজ উপায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'ডাকঘর' নাটকে বাতলে দিয়েছেন।
'ডাকঘর' নাটকের নায়ক অমল নামের এক দুরন্ত কিশোর। নিঃসন্তান মাধব দত্ত অমলকে দত্তক পুত্র হিসেবে এনেছে। অমলের হঠাৎ ব্যামো হয়েছে। কবিরাজ এসে অমলকে বাইরে বের হতে নিষেধ করে দিয়েছে। একটা বদ্ধ ঘরের মধ্যে রাত-দিন অমলকে খাঁচায় বন্দী পাখির মতো থাকতে হয়। দুরন্ত, কল্পনাবিলাসী ও ভাবুক ছেলে অমল। বদ্ধ ঘরে একলা থাকতে তাঁর ভীষণ কষ্ট লাগে, তীব্র একাকীত্ব ভীড় করে— "আমি কি ঐ উঠোনটাতেও যেতে পারবোনা।" অমলের কথাগুলো বেশ সহজ-সরল। তাঁর কল্পনাবিলাসী মনে আশপাশের কোনো কিছুই এড়ায় না। প্রকৃতির সমস্ত কিছুই সুন্দর হয়ে ওঠে তাঁর চোখে, দূর হয় রুক্ষতা। মাধব দত্ত বড় হয়ে পণ্ডিত হতে বলে অমলকে, কিন্তু সে শুধু ঘুরে বেড়াতে চায়— "আমাদের জানলার কাছে বসে সেই যে দূরে পাহাড় দেখা যায়– আমার ভারী ইচ্ছে করে ঐ পাহাড়টা পার হয়ে চলে যাই।" দুপুরবেলা কাঁধের লাঠিতে পুটলি বাঁধা এক লোককে দেখে অমলের ভালো লাগে। লোকটার মতো করেই অমল কাজ খুঁজে বেড়াতে চায়, ঝর্ণার জলে পা ভেজাতে চায়। বিদেশি লোক অমলকে ধরে নিয়ে যাবে– মাধব দত্ত সেই ভয় পায়; কিন্তু অমল বিদেশি লোকের সাথেই চলে যেতে চায়, এখান থেকে সেখানে শুধু ঘুরে বেড়াতে চায়। দইওয়ালাকে ঘরের জানালা দিয়ে ডেকে, অমল তাঁর সাথে চলে যেতে ইচ্ছে করে— "আমি যদি তোমার সঙ্গে চলে যেতে পারতুম তো যেতুম।" অমল কল্পনা করে দইওয়ালার পাহাড়ি গ্রামের সৌন্দর্যের বর্ণনা দেয়। আশ্চর্যান্বিত ভাবে তাঁর বর্ণনা মিলে যায়। অথচ অমল কখনো সেখানে যায় নি, কল্পনা করে সে কথাগুলো বলেছে। অমল তাঁর সহজ-সরল, সুললিত ভাষায় দইওয়ালার জীবনযাপন কে মধুর করে তোলে। দইওয়ালা অমলকে বলে— "দই বেঁচতে যে কত সুখ সে তোমার কাছে শিখে নিলুম।" এরপর জানালা দিয়ে রাজার প্রহরীকে ডেকে গল্প করে অমল। ছোট্ট অমলের সরল কথাগুলো যে কারোরই মন কারে। প্রথমে মজা করে প্রহরী অমলকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ভয় দেখালে সে আরো খুশি হয়; কিন্তু কেউ তাকে ধরে নিয়ে যায় না, এই বন্দীদশা থেকে মুক্তি দেয় না। প্রহরীর ঘন্টার শব্দ শুনে অমলের আরও উদাস লাগে— "কিন্তু, তোমার ঐ ঘন্টা বাজে ঢং ঢং ঢং– আর আমার মন কেমন করে।" প্রহরীর মুখে অমল ডাকঘর সম্পর্কে জানে, ডাকহরকরার কাজের কথা শুনে বড় হয়ে সে-ও ডাকহরকরা হতে চায়— "বড় হয়ে আমিও রাজার ডাকহরকরা হবো।" সবার মতো অমলও ডাকঘর থেকে চিঠি পাবে বলে ইচ্ছে করে— "রাজার কাছ থেকে রোজ একটা করে চিঠি যদি পাই তাহলে বেশ হয়, এই জানলার কাছে বসে বসে পড়ি। কিন্তু আমি তো পড়তে পারি নে।" এরপর মোড়লের সাথে অমলের কথা হয়। মোড়লকে অমল চিঠির কথা জিজ্ঞেস করলে ধুরন্ধর মোড়ল খেপে গিয়ে বলে— "রাজার সঙ্গে তোমার চিঠি চলে, মাধব দত্তের বড়ো বাড় হয়েছে দেখছি।" সেখানকার এক মালিনীর মেয়ে সুধার সাথে অমল কথা বলে জানালা দিয়ে। এক মুহূর্তেই তাঁদের মধ্যে বেশ ভাব জমে।
সুধা বলে, তাঁর তাড়া আছে অনেক; তখন অমল দুঃখ পেয়ে বলে— "তোমার দাঁড়াতে ইচ্ছা করে না, আমারও আর এখানে বসে থাকতে ইচ্ছা করে না।" সুধার সঙ্গে অমল ফুল তুলতে যেতে চায়, কিন্তু তা তো সম্ভব নয়। ফিরে যাওয়ার সময় যেন সুধা আবার অমলের সাথে গল্প করে সেই প্রতিশ্রুতি নেয় অমল। এবার ছেলের দল খেলা করতে যাওয়ার সময় অমলের ডাকে সাড়া দেয়। অমলের তাঁদের সাথে খেলতে খুব ইচ্ছে করে। কিন্তু সে তো গৃহবন্দী। তাই, অমল ছেলেগুলো কে তাঁর খেলনা গুলো দিয়ে বলে— "তোমরা আমার এই জানলার সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটু খেলা করো— আমি একটু দেখি।" অমলের এখন জানালার কাছে যাওয়াও বারণ— “পিসেমশায়, আজ আর আমার সেই জানলার কাছেও যেতে পারবো না?”
অমল আর কারো সাথে দেখা করতে পারে না। তাঁর ভীষণ মন খারাপ হয়। ঠাকুরদা ফকির বেশে অমলের কাছে এসে তাকে সান্ত্বনা দেয়। অমল দইওয়ালার কথা জিজ্ঞেস করলে মাধব দত্ত অমলকে বলে, দইয়ের ভাড় এখানে রেখে সে একটা কাজে গেছে। অমল ফকির কে চিঠির কথা জিজ্ঞেস করলে ঠাকুরদা বলে— "শুনেছি তো তাঁর চিঠি রওনা হয়ে বেড়িয়েছে, সে চিঠি এখন পথে আছে।" ফকিরের সাথে দেশে-দেশে ঘুরে ভিক্ষা করার ইচ্ছা করে অমল। কল্পনাবিলাসী মনে নানা গালগল্প করে সে। ফকির বেশে ঠাকুরদা অমলের কথায় সাড়া দিয়ে চলে। মোড়ল রাজার কাছে অমলের নামে রটিয়েছ যে সে নাকি রাজার চিঠি পায়। এজন্য মাধব দত্ত অমলকে রাগ দেখায়। ঠাকুরদা অমলকে সান্ত্বনা দেয়। কবিরাজ এসে অমলকে খারাপ খবর শোনায়। বাইরের বৈরী হাওয়া যেন একেবারেই ঘরে ঢুকতে না পারে, তাই অমলের ঘরের দরজায় তালা এঁটে সব ছিদ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর মোড়ল রাজার চিঠি এনে অমলকে দেয়। সেখানে লেখা ছিল যে, রাজা স্বয়ং এসে অমলের সাথে দেখা করবে। এটা শুনে অমল মহাখুশি হয়। রাজ কবিরাজ এসে অমলের ঘরের দরজা-জানালা খুলে দেয়। আকাশের তারা দেখে অমল খুব শান্তি পায়। রাজার জন্য অপেক্ষা করতে করতে অমল ঘুমিয়ে পড়ে। সুধা আসে অমলের জন্য ফুল নিয়ে। কবিরাজ জানায়, রাজা যখন এসে অমলকে ডাকবে তখন সে ঘুম থেকে উঠবে। ঘুম থেকে উঠলে অমলকে সুধা একটি কথা বলতে বলে যায় কবিরাজের কাছে— "বোলো যে, সুধা তোমাকে ভোলেনি।" কিন্তু অমল আর কখনো চোখ মেলে না, সে মৃত্যুর ঘুমে চিরতরে ঘুমিয়ে গেছে।
মৃত্যুর মধ্য দিয়েই যেন অমলের মুক্তি হলো। আসলে অমলের অসুখ ছিল মনে, ভুল চিকিৎসার কারণে সে আজ প্রাণ হারালো। একজন বন্দী শিশুর ভাষ্যে জীবন কতটা সহজ ও সুন্দর তা নিবিড়ভাবে পাঠকের মন ছুঁয়ে যায়। অথচ, আমরা এতো ঐশ্বর্যের মধ্যে থেকেও মানসিক শান্তি খুঁজে পাই না। অর্থের পেছনে ছুটতে ছুটতে আমরা মানুষের খোঁজ নিতে ভুলে যাই। সবসময় নিজেকে জাহির করে বেড়াই, কখনো অন্যের সুখ-দুঃখের কথা শুনতে চাই না। নাটকটি প্রসঙ্গে নিজের ভাষায় একটি কথা বলতে চাই— “আজকাল কেউ কারো কথা শোনে না, সবাই নিজের গল্প শোনাতে চায়/ কথা চেপে রেখে ফুসফুসে ক্যান্সার, সারছে না কোনো হাতুড়ে চিকিৎসায়।”
লেখক: মো. জাহিদ হাসান
শিক্ষার্থী,
বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।