গম্বুজ-মিনারে মোগল আমলের স্থাপত্যশৈলী তাড়াইলের সেকান্দরনগর জামে মসজিদ
রুহুল আমিন, তাড়াইল- কিশোরগঞ্জ:
কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে বহু স্থাপনা, মুছে গেছে ইতিহাসের অনেক স্মৃতি। কিন্তু চার শতকেরও বেশি সময় ধরে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার ধলা ইউনিয়নের সেকান্দরনগর সাহেববাড়ি জামে মসজিদ। গম্বুজ, মিনার, খিলান ও নান্দনিক কারুকাজে মোগল আমলের স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন এই মসজিদটি এখনো এলাকার মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।
স্থানীয় সূত্র ও ইতিহাস-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মসজিদটি আনুমানিক ১৬০০ শতকের দিকে নির্মিত। অর্থাৎ প্রায় চার শতকেরও বেশি সময় ধরে নানা পরিবর্তন ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে স্থাপনাটি আজও তার ঐতিহাসিক অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। এর নির্মাণশৈলী, গঠন, গম্বুজ, খিলান ও অলংকরণে সে সময়ের মোগল স্থাপত্যরীতির স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। প্রাচীন এই মসজিদ নির্মাণে পোড়া ইট, চুন-সুরকি, খয়ার ও সুপারির কষসহ সে সময় প্রচলিত নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছিল বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। আধুনিক নির্মাণসামগ্রী ও প্রযুক্তির অনুপস্থিতিতে কয়েক শতাব্দী ধরে স্থাপনাটি টিকে থাকা তৎকালীন নির্মাণ কৌশলের দক্ষতার পরিচয় বহন করে।
মসজিদের স্থাপত্যে রয়েছে সরলতা ও সৌন্দর্যের অপূর্ব সমন্বয়। পুরোনো ইটের গাঁথুনি, খিলান ও গম্বুজের নির্মাণশৈলী দেখলে সহজেই বোঝা যায়, এটি কোনো সাধারণ স্থাপনা নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সময়ের স্থাপত্যরুচি ও কারিগরি দক্ষতার নিদর্শন। মসজিদের ছাদে রয়েছে তিনটি গম্বুজ। মাঝখানে একটি বড় গম্বুজ এবং এর দুই পাশে রয়েছে তুলনামূলক ছোট দুটি গম্বুজ। তিন গম্বুজের এই বিন্যাস মসজিদের স্থাপত্যে এনে দিয়েছে ভারসাম্য ও স্বাতন্ত্র্য। এ ছাড়া মসজিদের ওপরের অংশে রয়েছে অষ্টভুজাকৃতির ১২টি ছোট মিনার। গম্বুজ ও মিনারের সমন্বিত স্থাপত্য মসজিদটিকে দূর থেকেই আলাদা করে চেনায়। মসজিদের প্রধান প্রবেশপথে রয়েছে বড় আকৃতির খিলান। খিলানের চারপাশের নকশা ও কারুকাজ প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর নান্দনিকতার পরিচয় বহন করে। মসজিদের ভেতরে রয়েছে কিবলামুখী নান্দনিক মিহরাব। প্রশস্ত নামাজকক্ষে একসঙ্গে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। এছাড়া মসজিদের বাইরের প্রশস্ত আঙিনায় আরও প্রায় ২০০ মুসল্লির নামাজ আদায়ের সুযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মুসল্লিরা এই মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করে আসছেন। ফলে ঐতিহাসিক স্থাপনা হওয়ার পাশাপাশি এটি এখনো একটি সক্রিয় ধর্মীয় উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
মসজিদের পাশেই রয়েছে একটি প্রাচীন জলাশয়। স্থানীয়দের মতে, মুসল্লিদের অজুর সুবিধার জন্যই একসময় এই জলাশয়টি খনন করা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও জলাশয়টি এখনো টিকে আছে। প্রাচীন মসজিদ, গম্বুজ-মিনার এবং পাশের জলাশয় সব মিলিয়ে পুরো স্থাপনাটি তৈরি করেছে একটি ঐতিহাসিক পরিবেশ। জলাশয়টির অস্তিত্ব মসজিদের অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন একটি মাত্রা যোগ করেছে।
মসজিদের ইমাম মাওলানা সৈয়দ আবু সায়েম জানান, ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটির সংরক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করে। সে সময় মসজিদের বিভিন্ন অংশে সৃষ্টি হওয়া ফাটল মেরামত এবং রংয়ের কাজ করা হয়।
তিনি আরও জানান, ২০২৫ সালে মসজিদের পাশের প্রাচীন জলাশয়ের পাড় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিলে মসজিদ ও আশপাশের এলাকা রক্ষায় প্রতিরক্ষা প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। এতে জলাশয়ের পাড় রক্ষার পাশাপাশি মসজিদটির নিরাপত্তাও কিছুটা নিশ্চিত হয়েছে।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের কারণে সেকান্দরনগর সাহেববাড়ি জামে মসজিদকে ঘিরে পর্যটনেরও সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। মোগল আমলের স্থাপত্যশৈলী, তিনটি গম্বুজ, ১২টি ছোট মিনার, প্রাচীন মিহরাব এবং পাশের জলাশয়—সব মিলিয়ে এটি ইতিহাসপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করার মতো একটি স্থাপনা। তবে ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখতে নিয়মিত সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। বিশেষ করে মসজিদের মূল স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে সংস্কারকাজ করা এবং আশপাশের পরিবেশ সংরক্ষণ করা জরুরি।