সৌদি আরবের নেতৃত্বে বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট: বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
জাহিন আবদুল্লাহ:
২০২৬ সালের ৩০ জুলাই রিয়াদে একটি উচ্চপর্যায়ের সামরিক বৈঠকের পর সৌদি আরব ১৩টি বন্ধু রাষ্ট্রের সমন্বয়ে একটি নতুন বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে।
এই জোটে বাংলাদেশ অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং সমুদ্র নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপকে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিরক্ষা কূটনীতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই প্রকল্পটি আসলে কী এবং এর লক্ষ্য কী?
এই জোটের আনুষ্ঠানিক নাম হলো Multinational Maritime Defense Alliance। সৌদি আরব এই জোটের প্রতিষ্ঠাতা এবং শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্র হিসেবে এর সদর দপ্তর পরিচালনা করবে।
জোটটির প্রধান উদ্দেশ্য:
- বাব আল-মান্দেব প্রণালি, লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা
- বাণিজ্যিক জাহাজ ও জ্বালানি ট্যাঙ্কারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
- গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ সামরিক মহড়া ও সমন্বিত টহল পরিচালনা
- সামুদ্রিক হুমকির বিরুদ্ধে দ্রুত সাড়া দেওয়া
জোটের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, এটি একটি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক জোট। এটি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্র বা সংস্থাকে লক্ষ্য করে গঠিত হয়নি, বরং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখাই এর মূল লক্ষ্য।
কেন এই জোটের প্রয়োজন হলো?
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় বিশ্ব বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এখন বিকল্প রুট হিসেবে লোহিত সাগরের ওপর নির্ভরশীল। তবে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এই রুটটিকেও অস্থির করে তুলেছে।
বিশ্বের ১০ থেকে ১২ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য এই পথ দিয়ে চলে। এখানে কোনো বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যেতে পারে — এই যৌথ ঝুঁকি মোকাবিলার জন্যই সৌদি আরব এই জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে।
কারা এই জোটে যুক্ত আছেন?
এই জোটের ১৪টি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশ:
সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর, জর্ডান, ইয়েমেন, বাংলাদেশ, সুদান, জিবুতি, সোমালিয়া এবং কমোরোস।
লক্ষণীয় বিষয়, উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান আপাতত এই জোটে নেই। তবে জোটটি অন্যান্য দেশের জন্যও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য লাভের দিকগুলো কী কী?
১. জ্বালানি নিরাপত্তা
বাংলাদেশের আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি-র একটি বড় অংশ এই সমুদ্রপথ ব্যবহার করে আসে। সমুদ্রপথ নিরাপদ থাকলে বাংলাদেশের আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে না।
২. প্রবাসী শ্রমিকদের কল্যাণ
সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে প্রায় ৪০ লাখ বাংলাদেশী শ্রমিক কাজ করেন, যাদের রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে তাদের কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
৩. নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন
এই জোটের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনী আধুনিক নৌ-যুদ্ধ কৌশল, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও যৌথ মহড়ার সুযোগ পাবে, যা Forces Goal 2030-এর অধীনে নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ায় সহায়ক হবে।
৪. নতুন বাজার সৃষ্টি
জোটের মাধ্যমে পূর্ব আফ্রিকার উপকূলীয় দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের নতুন রপ্তানি বাজার এবং জনশক্তি রপ্তানির পথ সুগম হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জসমূহ কী কী?
১. ইরানের সাথে সম্পর্কের টানাপড়েন
ইরানের সাথে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এই জোটকে ইরান যদি তাদের বিরুদ্ধে একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখে, তবে তেহরানের সাথে ঢাকার কূটনৈতিক দূরত্ব বাড়তে পারে।
২. ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি
বাংলাদেশের সংবিধানে "সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়" — এই নীতিটি প্রাধান্য পায়। কোনো ব্লকের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লে এই নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
৩. নিরাপত্তা ঝুঁকি
লোহিত সাগর বর্তমানে একটি সক্রিয় সংঘাতপূর্ণ এলাকা। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের বাইরে এই ধরনের সামরিক জোটে অংশ নিতে গিয়ে বাংলাদেশী নৌ-সদস্যদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
৪. বৃহৎ শক্তিদের প্রতিক্রিয়া
চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা অংশীদার এবং ভারতের ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। জোটের গতিপ্রকৃতি কোনো নির্দিষ্ট শক্তির দিকে বেশি ঝুঁকে পড়লে এই দুই নিকট বন্ধু দেশের সাথেও সম্পর্কে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন এই জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ মূলত একটি Bangladesh First নীতির প্রতিফলন, যেখানে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নিজেদের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখাই হবে বাংলাদেশের জন্য আগামী দিনের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা।
লেখক: জাহিন আবদুল্লাহ
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়