শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ

ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দানবাক্সে এবার মিলল রেকর্ড ১৫ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা

অনলাইন ডেস্ক ২৭ June ২০২৬ · Saturday · ১০:৪৪ অপরাহ্ণ
ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দানবাক্সে এবার মিলল রেকর্ড ১৫ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা

আশরাফুল ইসলাম তুষার,কিশোরগঞ্জ:

কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের ১৩ টি দানবাক্স গুলি ৬ মাস পর খুলে এবার রেকর্ড প্রায় ১৬ কোটি টাকা পাওয়া গেছে।সাথে পাওয়া গেছে বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার।

শনিবার (২৭ জুন ) সকাল ৭ টায় ৬ মাস পর এ দানবাক্সগুলো খোলা হয়।

কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন ও

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খানের উপস্থিতিতে দানবাক্সগুলো খোলা হয়। এছাড়াও পাগলা মসজিদ কমিটির সদস্য সচিব ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুল হাসান মারুফ সহ এ সময় বিপুল সংখ্যক পুলিশ,র‍্যাব ও আনসার সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন জানান,৬ মাস পর আজ শনিবার সকালে পাগলা মসজিদের ১৩ টি দানবাক্স খোলা হয়।তবে প্রতি ৩-৪ মাস পর পর দান বাক্স খোলা হলেও এবার ৬ মাস পর দানবাক্স খোলা হয়।

মসজিদ পরিচালনা কমিটি সূত্রে জানা গেছে,শনিবার সকাল ৭ টার দিকে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন ও পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে মসজিদের ১৩ টি দানবাক্স খোলা হয়েছে। দানবাক্সগুলো খুলে ৪৩ টি বস্তায় ভরে টাকাগুলো মসজিদের দোতলায় নেয়া হয় গণনার জন্য।রাত সাড়ে ৮ টায় টাকা গণনা শেষে এবার

রেকর্ড ১৫ কোটি ৯০ লক্ষ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা পাওয়া গেছে।

টাকা গণনার কাজে কিশোরগঞ্জের জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি), রূপালী ব্যাংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) সহ মাদরাসার ২৫৭ জন ছাত্র, ব্যাংকের ৭০ জন স্টাফ, মসজিদ কমিটির ৩৪ জন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১০ জন সদস্য অংশ নিয়েছেন।

পাগলা মসজিদ কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন জানান, কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদ ও ইসলামিক কমপ্লেক্সের ১০টি স্থায়ী সিন্দুক এবং ৩টি অস্থায়ী ট্রাংক দানবাক্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ছয় মাস পর শনিবার সকাল ৭টায় সিন্দুকগুলো খোলা হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর দানবাক্স খুলে ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা পাওয়া যায়, যা রূপালী ব্যাংকে পাগলা মসজিদের হিসাবে জমা করা হয়। এছাড়া উদ্ধার হওয়া স্বর্ণ, রৌপ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা সিলগালা করে জেলা ট্রেজারিতে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

তিনি জানান,শনিবার পর্যন্ত বর্তমানে পাগলা মসজিদের তহবিলে মোট ১১৪ কোটি ১৩ লাখ ৭ হাজার ৩৫২ টাকা জমা রয়েছে। অনলাইনে দান গ্রহণের জন্য www.paglamosque.org ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে এবং এর বাংলা সংস্করণও চালু রয়েছে। এ পর্যন্ত অনলাইনের মাধ্যমে ২৪ লাখ ৭৬ হাজার ৮৮২ টাকা অনুদান পাওয়া গেছে।

জেলা প্রশাসক বলেন, পাগলা মসজিদের আধুনিক ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ লক্ষ্যে মসজিদ কমপ্লেক্স ও কবরস্থানের মধ্যবর্তী ৫৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ জমি মসজিদের নামে ক্রয় করা হয়েছে। বর্তমানে নান্দনিক নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। পাশাপাশি মুসল্লিদের সুবিধার্থে মসজিদের বাইরে পাবলিক টয়লেট নির্মাণের কাজও এগিয়ে চলছে।

তিনি জানান, পাগলা মসজিদের তহবিল থেকে কমপ্লেক্সের মাদ্রাসার ১৩০ জন এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থীর লেখাপড়া ও ভরণপোষণের ব্যয় বহন করা হয়। এছাড়া ৩৫ জন কর্মচারী ও ১০ জন আনসার সদস্যের বেতন, মসজিদের বিদ্যুৎ বিল ও উন্নয়নমূলক ব্যয় মেটানো হয়। একই সঙ্গে তহবিলের লভ্যাংশ থেকে কিশোরগঞ্জ জেলার দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সহায়তাও প্রদান করা হয়।

তিনি আরও বলেন, দানবাক্সের টাকা গণনার কাজে জামিয়া ইমদাদিয়া মাদ্রাসার ৩০০ জন শিক্ষার্থী, পাগলা মসজিদ মাদ্রাসার ১০৬ জন শিক্ষার্থী, রূপালী ব্যাংকের ১৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী, পাগলা মসজিদের ৩৫ জন স্টাফ এবং জেলা প্রশাসনের ১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী অংশ নিয়েছেন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সভাপতিত্বে সাত সদস্যের একটি উপকমিটি পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

জেলা প্রশাসক জানান, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১৩ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ৪০ জন পুলিশ সদস্য, ৮ জন র‍্যাব সদস্য এবং ২০ জন আনসার সদস্য সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন।

মসজিদের খতিব, এলাকাবাসী ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা লোকজন সূত্রে জানা যায়, এ মসজিদে মানত করলে মনের আশা পূর্ণ হয়। এমন ধারণা থেকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এ মসজিদে দান করে থাকেন।

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মো. কামরুল হাসান মারুফ জানান, গণনা করা অর্থ পর্যায়ক্রমে মসজিদের হিসাবভুক্ত করার জন্য রূপালী ব্যাংক কিশোরগঞ্জ শাখায় পাঠানো হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, দানবাক্সের টাকা গণনার কাজে প্রায় ৫৯০ জনের একটি বিশাল দল অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, ব্যাংকের কর্মকর্তা, শিক্ষক, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, আনসার সদস্যসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে গণনা কার্যক্রম সম্পন্ন করতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি রয়েছে।

এবারের গণনায় পাওয়া অর্থ আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এর আগে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর তিন মাস ২৭ দিন পর দানবাক্স খোলা হলে ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা পাওয়া যায়। তখনও বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার উদ্ধার হয়েছিল।

জনশ্রুতি আছে, এক সময় এক আধ্যাত্মিক পাগল সাধকের বাস ছিল কিশোরগঞ্জ পৌর শহরের হারুয়া ও রাকুয়াইল এলাকার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত নরসুন্দা নদের মধ্যবর্তী স্থানে জেগে ওঠা উঁচু টিলাকৃতির স্থানটিতে। মুসলিম-হিন্দু নির্বিশেষে সব ধর্মের লোকজনের যাতায়াত ছিল ওই সাধকের আস্তানায়। পাগল সাধকের দেহাবসানের পর তার উপাসনালয়টিকে কামেল পাগল পীরের মসজিদ হিসেবে ব্যবহার শুরু করে এলাকাবাসী।

কিন্তু ওই সাধকের দেহাবসানের পর থেকে আশ্চর্যজনকভাবে এলাকা এমনকি দেশের দূর-দূরান্তের লোকজনের ভিড় বাড়তে থাকে। মানত কিংবা দান খয়রাত করলে মনোবাসনা পূরণ হয় এমন বিশ্বাস থেকে বিভিন্ন বয়সের হিন্দু-মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের নারী-পুরুষ মানত নিয়ে আসেন এ মসজিদে। তারা নগদ টাকা-পয়সা, স্বর্ণ ও রুপার অলঙ্কারের পাশাপাশি গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি এমনকি বৈদেশিক মুদ্রাও দান করেন।

বর্তমানে কিশোরগঞ্জ শহরের ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে পাগলা মসজিদ অন্যতম। শহরের পশ্চিমে হারুয়া এলাকায় নরসুন্দা নদীর তীরে মাত্র ১০ শতাংশ জমির ওপর মসজিদটি গড়ে উঠলেও বর্তমানে মসজিদ কমপ্লেক্সটি ৩ একর ৮৮ শতাংশ জায়গা আছে। এ মসজিদের পরিধির সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে এর খ্যাতি ও ঐতিহাসিক মূল্য।

এরই মধ্যে দেশের অন্যতম আয়কারী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত মসজিদটিকে পাগলা মসজিদ ইসলামি কমপ্লেক্স নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়া মসজিদের আয় থেকে বিভিন্ন সেবামূলক খাতে অর্থ সাহায্য করা হয়।

মসজিদের দান থেকে পাওয়া এসব অর্থ সংশ্লিষ্ট মসজিদসহ জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানার পাশাপাশি বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় হয়। এছাড়া করোনাকালে রোগীদের সেবায় নিয়োজিত শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৮০ জন স্বেচ্ছাসেবককেও অনুদান দেওয়া হয়েছিল এ দানের টাকা থেকে।

পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটি সূত্রে জানিয়েছে, ঐতিহ্যবাহী পাগলা মসজিদে আন্তর্জাতিক মানের দৃষ্টিনন্দন ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুতই এর কাজ শুরু হবে। যার নামকরণ হবে পাগলা মসজিদ ইসলামিক কমপ্লেক্স। এটি নির্মাণে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৫ কোটি টাকা। সেখানে ৩০ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারবেন।

মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

আরও পড়ুন

নিকলীতে বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বর্ণাঢ্য র‍্যালী

নিকলীতে বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বর্ণাঢ্য র‍্যালী

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কিশো...

০১ September ২০২৬ · Tuesday · ১১:০৮ অপরাহ্ণ
নিকলীতে বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বর্ণাঢ্য র‍্যালী

নিকলীতে বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বর্ণাঢ্য র‍্যালী

নিকলী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি'র ৪৮ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক...

০১ September ২০২৬ · Tuesday · ০১:২০ অপরাহ্ণ