চরাঞ্চলে কুরআনের আলো ছড়াচ্ছে চর কাটগিরাই হাফিজিয়া মাদ্রাসা
মোঃ সাইফুর রহমান, কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার নুনখাওয়া ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল চর কাটগিরাই। নদীভাঙন, যোগাযোগ সংকট ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও এই জনপদের মানুষ আজ গর্বের সঙ্গে উচ্চারণ করে একটি প্রতিষ্ঠানের নাম— চর কাটগিরাই দারুন নাজাত নূরানী ও হাফিজিয়া মাদ্রাসা। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি কুরআনি শিক্ষা, ইসলামী আদর্শ ও নৈতিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিয়ে চরাঞ্চলে জ্ঞানের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি শুরুতে সীমিত পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও বর্তমানে এটি একটি বৃহৎ দ্বীনি শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এলাকার শিশু-কিশোরদের কুরআন শিক্ষা, হিফজ ও ইসলামী জ্ঞানে সমৃদ্ধ করে তোলার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে মাদ্রাসাটি।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির তিনটি পৃথক শাখায় প্রায় ৭০০-এর অধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। মূল শাখা চর কাটগিরাই দারুন নাজাত নূরানী ও হাফিজিয়া মাদ্রাসার পাশাপাশি বালিকাদের জন্য পরিচালিত হচ্ছে দারুন নাজাত আয়েশা খান মহিলা মাদ্রাসা এবং হিফজ বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে দারুন নাজাত হিফজ মাদ্রাসা। তিনটি শাখা মিলিয়ে এলাকায় দ্বীনি শিক্ষার একটি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত ভিত্তি গড়ে উঠেছে।
প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্বারী ও আলেমদের পরামর্শক্রমে পরিচালিত হয়ে আসছে। মাদ্রাসার সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন হাফেজ মাওলানা ইমরান হুসাইন হাবিবী (হাফি.) এবং পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন হাফেজ মাওলানা মোঃ শাহজালাল। তাঁদের দূরদর্শী নেতৃত্ব, আন্তরিকতা এবং শিক্ষকদের নিরলস প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছে।
শুধু পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয়, শিক্ষার্থীদের মেধা ও প্রতিভা বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ পর্যন্ত মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন কুরআন তেলাওয়াত, হিফজ ও ইসলামী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করেছে। বিভিন্ন সময়ে দেশ-বিদেশে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানসহ অসংখ্য সম্মাননা, পদক, ক্রেস্ট ও আর্থিক পুরস্কার লাভ করেছে শিক্ষার্থীরা।
প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অর্জিত পুরস্কার ও সম্মাননার সংখ্যা ইতোমধ্যে প্রায় বারোশোরও বেশি। যা একটি গ্রামীণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় শিক্ষানুরাগী, অভিভাবক ও সচেতন মহল মনে করেন, চরাঞ্চলের মতো একটি প্রত্যন্ত এলাকায় এমন একটি দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধু কুরআনের শিক্ষাই ছড়িয়ে দিচ্ছে না, বরং সমাজে নৈতিকতা, মানবিকতা, শৃঙ্খলা ও ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের নৈতিক ও আদর্শবান মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য এই প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখছেন।
এলাকাবাসীর মতে, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা পেলে প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও বৃহত্তর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে চরাঞ্চলের শিক্ষার উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
চর কাটগিরাই দারুন নাজাত নূরানী ও হাফিজিয়া মাদ্রাসা আজ শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম নয়; এটি চরাঞ্চলে কুরআনি শিক্ষার এক সফল আন্দোলন, একটি স্বপ্ন ও একটি গৌরবের প্রতীক। দীর্ঘদিনের সুনাম, শিক্ষার মান, দক্ষ শিক্ষকবৃন্দ এবং শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক সাফল্যের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি কুড়িগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কুরআনের আলো ছড়িয়ে আগামী প্রজন্মকে আলোকিত করার এই মহৎ প্রয়াস ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে— এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় মানুষের।