চলছে ফুটবল বিশ্বকাপ প্রচুর বিক্রি হচ্ছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের পতাকা
আশরাফুল ইসলাম তুষার,কিশোরগঞ্জ:
ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তাপ মাঠে গড়ানোয় কিশোরগঞ্জে শুরু হয়েছে সমর্থকদের উন্মাদনা। প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে বিভিন্ন দেশের পতাকা কিনতে ভিড় করছেন ফুটবলপ্রেমীরা। বিশেষ করে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, পর্তুগাল ও ফ্রান্সের পতাকার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এতে জমে উঠেছে পতাকা বিক্রির মৌসুমি ব্যবসা।জেলার বিভিন্ন বাজার, ফুটপাত, রাস্তার মোড় ও অস্থায়ী দোকানে রঙিন পতাকা বিক্রি করতে দেখা গেছে ব্যবসায়ীদের। ছোট আকারের পতাকা থেকে শুরু করে ভবন ও ছাদে টানানোর জন্য বড় আকারের পতাকাও বিক্রি হচ্ছে। পতাকার পাশাপাশি জার্সি, হেডব্যান্ড, ক্যাপ ও বিভিন্ন সমর্থক সামগ্রীও বিক্রি হচ্ছে ব্যাপকহারে। ব্যবসায়ীরা জানান, বিশ্বকাপ শুরু হওয়ায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই বিক্রি বাড়তে শুরু করেছে। প্রতিদিনই ক্রেতাদের ভিড় বাড়ছে। অনেকেই আগেভাগেই নিজেদের পছন্দের দলের পতাকা কিনে বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে টানিয়ে দিয়েছেন।
জেলা শহরের রথখলা এলাকার পতাকা বিক্রেতা মো. সোহেল রানা বলেন, বিশ্বকাপ এলেই আমাদের ব্যবসা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এবারও আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিন শতাধিক পতাকা বিক্রি হচ্ছে।
আরেক ব্যবসায়ী আব্দুল আলী বলেন, ছোট পতাকা ৫০ থেকে ১৫০ টাকা এবং বড় পতাকা ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে এবার ভালো ব্যবসার আশা করছি।তিনি আরো বলেন, সারা বছর অন্য ব্যবসা করলেও বিশ্বকাপ এলেই পতাকা বিক্রি করি। এতে বাড়তি আয় হয়। বিভিন্ন আকারের পতাকা বিক্রি হচ্ছে। তরুণদের মধ্যে উৎসাহ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
ফুটবল প্রেমী আল আমিন হাসান বলেন,
বিশ্বকাপ মানেই অন্যরকম উৎসব। আমি আর্জেন্টিনার সাপোর্টার, প্রিয় দলের পতাকা টানিয়ে সমর্থন জানাতে ভালো লাগে। খেলা শুরু হওয়ার আগেই আমরা বন্ধুদের নিয়ে এলাকার বিভিন্ন স্থানে পতাকা লাগিয়েছি।
স্থানীয় বাসিন্দা আলী হোসেন বলেন, বিশ্বকাপ এলেই এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয় শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব মানুষের মাঝে। ব্যবসায়ীরা জানান, বিশ্বকাপের উদ্বোধনের পর থেকে পতাকা ও সমর্থক সামগ্রীর বিক্রি আরো বেড়েছে। ফুটবলপ্রেমীদের উচ্ছ্বাসে জেলা শহর থেকে শুরু করে জেলার বিভিন্ন উপজেলার রাস্তাঘাট বাড়িঘর এরই মধ্যে রঙিন হয়ে উঠেছে বিভিন্ন দেশের পতাকায়। বিশ্বকাপকে ঘিরে এ মৌসুমি ব্যবসা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্যও বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
এদিকে জেলা শহর ও উপজেলা শহরের বিভিন্ন দোকান ও ফুটপাত ঘুরে জার্সির বিপুল সমাহার দেখা গেল। দোকানের সামনে সারি সারি ঝুলছে বিভিন্ন দেশের পতাকার রঙে সাজানো পোশাক। কেউ নিজের জন্য কিনছেন। কেউ কিনছেন সন্তানের জন্য। কেউ আবার বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখার প্রস্তুতি হিসেবে জার্সি সংগ্রহ করছেন।
তেরিপট্টি এলাকায় অবস্থিত ফ্যাশন বাজ দুকানে ঢুকতেই চোখে পড়ে জার্সির স্তূপ। একের পর এক ক্রেতা এসে জার্সি দেখছেন। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী সাজ্জাদ হোসেন পাপ্পু ও মনির হোসেন বলেন, বিশ্বকাপ এলেই জার্সির বাজার জমে ওঠে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে আর্জেন্টিনার জার্সি। এরপর ব্রাজিল, ফ্রান্স ও স্পেন। তাদের দোকানে ৩০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা দামের জার্সি পাওয়া যায়। শিশু থেকে প্রাপ্তবয়স্ক—সব বয়সীদের জন্য রয়েছে আলাদা সংগ্রহ। সাধারণ মানের জার্সি ২৫০ থেকে ৪০০ টাকার মধ্যে। উন্নত কাপড়ের জার্সির দাম ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। আর প্রিমিয়াম সংস্করণের দাম এক হাজার টাকার বেশি।
কিশোরগঞ্জের ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে রখখলা তেরিপট্টি, গৌরাঙ্গবাজার ও একরামপুর এলাকা জার্সির জন্য এক পরিচিত ঠিকানা। এইসব এলাকায় রয়েছে ছোট-বড় অর্ধশতাধিক ক্রীড়াসামগ্রীর দোকান। ক্রিকেট ব্যাট-বল, ফুটবল, বুট, গ্লাভস, ট্র্যাকস্যুট থেকে শুরু করে খেলাধুলার প্রায় সব সরঞ্জামই পাওয়া যায় এখানে।
সাধারণ সময়েও ক্রেতাদের ভিড় থাকে। তবে বিশ্বকাপের মতো বড় আসর এলে পুরো এলাকার চেহারাই বদলে যায়। দোকানের সামনে ঝুলে যায় বিভিন্ন দেশের জার্সি। বাড়ে ক্রেতার ভিড়।একরামপুর জার্সির দুকানগুলিতে গিয়ে দেখা যায়, দোকানের ভেতর-বাইরে মানুষের ভিড়। কেউ মেসির জার্সি খুঁজছেন। কেউ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর। আবার কেউ খুঁজছেন এমবাপ্পের নাম লেখা জার্সি।দুকানি আবুল কালাম বলেন, ‘ফুটবল বিশ্বকাপটাই আমাদের জন্য ঈদ। এ সময় বিক্রি সাধারণ সময়ের তুলনায় পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেড়ে যায়।’
জার্সি বিক্রেতা লিংকন বলেন,আমাদের দোকানে চীন ও বাংলাদেশে তৈরি জার্সি পাওয়া যায়। তবে এবার সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে খেলোয়াড়ের নাম ও নম্বর লেখা জার্সি। বিশেষ করে মেসি, নেইমার, এমবাপ্পে ও রোনালদোর নাম লেখা জার্সির চাহিদা বেশি। দল হিসেবে এগিয়ে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল। তিনি বলেন, মেসির জার্সিই সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। মেসি লেখা ১০ নম্বর জার্সি হলেই বিক্রির গ্যারান্টি আছে।
এদিকে একসময় জার্সির বাজারে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে ঘিরে। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ফ্রান্স ও স্পেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ দুই দলের সাফল্যের কারণে তরুণদের মধ্যে তাদের সমর্থকও বেড়েছে।
জেলার এক সময়কার তারকা ফুটবলার ও পরবর্তীতে কোচ লিংকন দাস বলেন, মেসির কারণে আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তা এখনো সবচেয়ে বেশি। তবে নতুন প্রজন্মের অনেকেই স্পেন ও ফ্রান্সের জার্সি খুঁজছেন। তরুণ খেলোয়াড়দের প্রতি আগ্রহও বাড়ছে।
জার্সি ক্রেতা আতাউল হাসান দিনার বলেন, ‘ফ্রান্স দলটা খুব গোছানো। প্রায় সব পজিশনেই ভালো খেলোয়াড় আছে। অভিজ্ঞতা আর তারুণ্যের দারুণ সমন্বয় রয়েছে। তাই আমি মনে করি,আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পাশাপাশি তারাও বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় দাবিদার।’