শিশু বনাম শ্রমিক শিশু: শিশু শ্রম প্রতিরোধ দিবসের প্রেক্ষাপটে এক অনিবার্য ভাবনা
মাসুদ মাহাতাব, ঢাকা
আজ ১২ জুন আন্তর্জাতিক শিশু শ্রম প্রতিরোধ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে দেশে-বিদেশে নানা আয়োজন, আলোচনা সভা, সংলাপ ও র্যালির মাধ্যমে শিশু শ্রম বন্ধের প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। কিন্তু এতসব আলোচনার ভিড়েও প্রায়শই আড়ালেই থেকে যায় এক নীরব ও অবহেলিত বাস্তবতা “শিশু শ্রমিক”।
প্রশ্ন হলো, ‘শিশু’ শব্দের পাশে ‘শ্রমিক’ শব্দটি বসানো কি আমাদের কানে বেমানান লাগে? নাকি আমরা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে এটি এখন স্বাভাবিক বলে মনে হয়? যদি বেমানান না লাগে, তবে স্বীকার করতেই হবে—এই শব্দযুগল আমাদের সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে গেছে, এবং এর অবসান সহজ হবে না।
আমরা চাই, শিশুকে কেবল ‘শিশু’ হিসেবেই দেখা হোক ‘শিশু শ্রমিক’ হিসেবে নয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। ঘর থেকে বেরোলেই তাদের দেখা মেলে রাস্তাঘাটে, হোটেল-রেস্তোরাঁয়, দোকানপাটে, গার্মেন্টসে, বিভিন্ন কারখানায়, এমনকি বাসাবাড়ির কাজেও। এদের সংখ্যা অগণিত। দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম তাদের শৈশব কেড়ে নিয়ে ঠেলে দিয়েছে শ্রমের কঠিন বাস্তবতায়।
এই শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কদের মতো সমান কাজ করতে না পারলেও কাজের চাপ থেকে মুক্ত নয়। মজুরির ক্ষেত্রেও তারা বৈষম্যের শিকার। একই শ্রম দিয়ে তারা পায় কম পারিশ্রমিক, কম সম্মান এবং অনেক ক্ষেত্রে শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়। তবুও সমাজ তাদের পরিচয় দেয় শ্রমিক’, আরও নির্দিষ্ট করে বললে ‘শিশু শ্রমিক’।
ইউনিসেফের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে শিশুদের একটি বড় অংশ শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রবেশ করলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর সম্পন্ন করার আগেই ঝরে পড়ে। অন্যদিকে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, বিপুল সংখ্যক শিশু কেবল খাদ্যের বিনিময়ে কিংবা অত্যন্ত কম মজুরিতে শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক বঞ্চনার চিত্র নয়, বরং তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ারও বাস্তব প্রতিফলন।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে প্রত্যেকেই শিশু। বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩-তেও একই সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে বলা হয়েছে, যে কোনো শ্রম বা কর্মপরিবেশ যদি শিশুর দৈহিক, মানসিক, আত্মিক, নৈতিক ও সামাজিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর বা বিপজ্জনক হয়, তবে তা শিশুশ্রম হিসেবে বিবেচিত হবে। ইউনিসেফের ভাষায়, “যে ধরনের কাজ শিশুর স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে ব্যাহত করে, তাই শিশুশ্রম।”
অর্থাৎ, যাদের হাতে বই, খাতা ও রঙিন স্বপ্ন থাকার কথা, তাদের অনেকেই বাস্তবে তুলে নিচ্ছে শ্রমের ভার। এটি শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর মানবিক সংকট এবং একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের পথে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। মধ্যম আয়ের দেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই উন্নয়নের সুফল কি দেশের প্রতিটি শিশু সমানভাবে পাচ্ছে? নাকি একটি বড় অংশ এখনও প্রান্তিকতার অন্ধকারে রয়ে গেছে?
বাস্তবতা বলছে, এখনও দেশের বহু শিশু বিভিন্ন ধরনের শ্রমে নিয়োজিত, যা তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং মানসিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। শ্রমিক বলতে আমরা সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কথা ভাবি। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের সামনে এমন এক চিত্র তুলে ধরে, যেখানে শিশুরাও শ্রম দিচ্ছে—এবং অনেক ক্ষেত্রেই তারা আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করছে।
এই বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া নয়, বরং পরিবর্তন করাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ। শিশুদের শ্রম থেকে বের করে এনে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। তাদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে মানসম্মত শিক্ষা, পর্যাপ্ত পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপদ জীবনযাপনের সুযোগ। শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রতিটি নাগরিক, প্রতিটি অভিভাবক এবং প্রতিটি সচেতন মানুষের দায়িত্ব রয়েছে এই বিষয়ে।
আমরা প্রায়ই বলি শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ।কিন্তু সেই ভবিষ্যৎকে যদি আমরা আজ সুরক্ষিত করতে না পারি, তাহলে আগামী দিনের উন্নয়নও টেকসই হবে না। তাই শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে, আরও দৃঢ়ভাবে কাজ করতে হবে।
শিশু পাবে তার প্রাপ্য শৈশব—খেলাধুলা, শিক্ষা, ভালোবাসা ও নিরাপত্তায় ভরা এক সুন্দর জীবন। তারা বড় হবে হাসিমুখে, স্বপ্ন নিয়ে, সম্ভাবনা নিয়ে।
আন্তর্জাতিক শিশু শ্রম প্রতিরোধ দিবসে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার
শিশু থাকবে শিশুই, শ্রমিক নয়।
আরিফুল ইসলাম
শিশু অধিকার কর্মী ও নির্বাহী পরিচালক
সিড ফাউন্ডেশন, ঢাকা।