৭৪ বছরের সরকারি মালিকানার অবসান: ৩০ বছরের জন্য মাহাবুব গ্রুপের হাতে ক্রিসেন্ট জুট মিলস
মোঃ আল-মাহফুজ শাওন, খুলনা:
খুলনার ঐতিহ্যবাহী শিল্পপ্রতিষ্ঠান দি ক্রিসেন্ট জুট মিলস লিমিটেড ৭৪ বছরের সরকারি মালিকানার অধ্যায়ের ইতি টেনে ৩০ বছরের জন্য বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাচ্ছে। দীর্ঘদিন উৎপাদনহীন ও লোকসানে থাকা মিলটি ২০২৫ সালের ১৬ জুন স্বাক্ষরিত এক চুক্তির মাধ্যমে মাহাবুব গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে লিজ দেওয়া হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে ৫০ লাখ টাকা ভাড়ায় ৩০ বছরের জন্য মিলটির দায়িত্ব গ্রহণ করবে। তবে মিল পুনরুজ্জীবনের সুযোগ দিতে হস্তান্তরের পর প্রথম তিন বছর লিজ গ্রহীতাকে কোনো মাসিক ভাড়া পরিশোধ করতে হবে না। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সুরক্ষায় লিজ গ্রহীতা ১৮ কোটি টাকা জামানত হিসেবে সরকারি তহবিলে জমা রেখেছেন।
বিজেএমসির পক্ষে চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ কবির উদ্দিন শিকদার এবং মাহাবুব গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ মাহবুবুর রহমান চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
দীর্ঘ লোকসানের বোঝায় বন্ধ হয় উৎপাদন
একসময় এশিয়ার বৃহৎ পাটকলগুলোর অন্যতম ক্রিসেন্ট জুট মিলস বছরের পর বছর লোকসানের মধ্যে পরিচালিত হচ্ছিল। বিশ্ববাজারে পাটপণ্যের চাহিদা হ্রাস, কাঁচা পাটের সংকট, ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং শ্রমিক অসন্তোষের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হতে থাকে। উৎপাদন সচল রাখতে রূপালী ব্যাংকের শামস ভবন শাখা থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হয়।
অবশেষে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) ২০২০ সালের ১ জুলাই মিলটির উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে। এরপর থেকে বিশাল এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি কার্যত উৎপাদনহীন অবস্থায় পড়ে থাকে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থাকলেও নেওয়া হয় লিজের সিদ্ধান্ত
২০২৪ ও ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা ক্রিসেন্ট জুট মিলস পুনরায় চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে রাজনৈতিক মহলের অনেকের অজান্তেই নির্বাচনের প্রায় সাত মাস আগে অন্তর্বর্তী সরকার মিলটি বেসরকারি খাতে লিজ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের আশা
বুধবার বিজেএমসির চেয়ারম্যান এবং লিজ গ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা মিল এলাকা পরিদর্শন করেন।
মিলের মহাব্যবস্থাপক খান মোঃ কামরুল ইসলাম জানান, লিজ গ্রহীতার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি বলেন, “বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার শ্রমিক এই মিলের উৎপাদন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। বর্তমানে অব্যবহৃত মালামাল অপসারণের কাজ চলছে। টেন্ডার গ্রহীতারা মালামাল সরিয়ে নেওয়ার পর মিলটি আনুষ্ঠানিকভাবে লিজ গ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করা হবে।”
পুরনো যন্ত্রপাতি বিক্রি
সূত্র জানায়, ৭৪ বছর আগে স্থাপিত মিলের পুরনো তাঁত, লোহার সরঞ্জাম ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ ১০টি প্রতিষ্ঠানের কাছে মোট ২৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। এসব মালামাল অপসারণের কাজ শেষ হলে আগামী মাসের মাঝামাঝি সময়ে মিলটি আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ব্যবস্থাপনার কাছে হস্তান্তর করা হবে।
শুধু পাটপণ্য নয়, উৎপাদিত হতে পারে নতুন পণ্যও
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, নতুন ব্যবস্থাপনায় শুধু পাট ও পাটজাত পণ্য নয়, বাজার চাহিদা অনুযায়ী অন্যান্য শিল্পপণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে দীর্ঘদিন অচল থাকা শিল্পাঞ্চল খালিশপুরে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইতিহাসের সাক্ষী ক্রিসেন্ট জুট মিলস
ভৈরব নদের তীরে খুলনার শিল্পনগরী খালিশপুরে ১৯৫২ সালের ২০ মার্চ ১১৩ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় ক্রিসেন্ট জুট মিলস। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন (ইপিআইডিসি) মিলটি প্রতিষ্ঠা করে। পাকিস্তানের প্রভাবশালী ‘২২ পরিবারের’ অন্যতম আগাখান গ্রুপ এ প্রকল্পের সহযোগী ও অংশীদার ছিল।
১৯৫৪ সালের ১ অক্টোবর মিলটির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের পাটশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা প্রতিষ্ঠানটি এখন নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ক্রিসেন্ট জুট মিলস আবারও খুলনার শিল্প ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।