কালাইয়ে কিস্তি দিতে না পারায় গৃহবধূকে ৭ ঘন্টা আটকে রাখার অভিযোগ
মোঃ মোকাররম হোসাইন
কালাই(জয়পুরহাট)প্রতিনিধি:
জয়পুরহাটের কালাইয়ে ঋণের কিস্তি দিতে না পারায় ঈদের টানা ছুটির মধ্যে এক নারী সদস্যকে বাড়ি থেকে তুলে এনে এনজিও কার্যালয়ে গভীর রাত পর্যন্ত আটক রেখে মানসিক নির্যাতন করার অভিযোগ উঠেছে জেআরডিএম নামক এক এনজিও’র এরিয়া ব্যবস্থাপক ও মাঠকর্মীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনা গত রোববার (৩১ মে) দিবাগত রাতে কালাই পৌরশহরে এনজিওপাড়াতে ঘটেছে। রাতেই ঘটনাটি জানাজানির পর স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা ওই এনজিও কার্যালয়ে গেলে তারা প্রথমে ত্বর্কে জড়ান। একপর্যায়ে নিজেরা ভূল স্বীকার করে ওই নারীকে ছেড়ে দেন। রাত সাড়ে ১০ টার দিকে ওই নারী তার ছেলের সাথে বাড়িতে ফিরে যান।
এনজিও ও ভূক্তভোগী নারীর সাথে কথা বলে জানা যায়, কালাই পৌরশহরের আঁওড়া কালিমহুর মহল্লার দিনমজুর মো. বাবলু সরকারের স্ত্রী মোছা. আলপনা বেগম দীর্ঘ পাঁচ বছর যাবৎ জেআরডিএম নামক এনজিও’র কালাই শাখা থেকে কখনও সাপ্তাহিক আবার কখন মাসিক কিস্তিতে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধও করে আসছেন। সর্বশেষ গত ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মাসিক কিস্তিতে ৮০ হাজার টাকা ঋণ নেন। তাতে ওই নারীকে মাসিক কিস্তি দিতে হয় ৮ হাজার ৫’শ টাকা। ঋণ নেওয়ার পর নিয়মিত পাঁচটি কিস্তি তিনি পরিশোধও করেছেন। কিন্তু গত দুই মাস ধরে তিনি কিস্তির টাকা দিতে পারেননি। এরইমধ্যে ঈদের টানা বন্ধ হয় সকল অফিস আদালত। বকেয়া দুই মাসের কিস্তির টাকা নিতে গত রোববার বিকেল সাড়ে তিনটায় বন্ধের দিনে ওই এনজিও’র নারী মাঠকর্মী জাহানারা বেগম ভূক্তভোগীর বাড়িতে যান। এ সময় ভূক্তভোগীর ছেলে আজিজার রহমান তার নিকট আগামী বুধবার পর্যন্ত সময় চান। ভূক্তভোগীর ছেলের কথায় কর্ণপাত না করে এনজিও কর্মী জাহানারা বেগম কৌশলে তাকে বাড়ি থেকে অফিসে নিয়ে এসে আটকে রাখেন। বিকেল ৫ টা ২৮ মিনিটে ওই এনজিও’র এরিয়া ব্যবস্থাপক মো. আরমান হোসেন সরকার ভূক্তভোগী নারীর ছেলে আজিজার রহমানের মোবাইলে কল করে জানান, কিস্তির টাকা অফিসে জমা দিয়ে তোমার মাকে নিয়ে যাও। মাকে উদ্ধার করতে ছেলে টাকার জন্য ছুটাছুটি করতে থাকে। একপর্যায়ে ঘটনাটি জানাজানি হয়।
ভূক্তভোগী নারীর ছেলে আজিজার রহমান বলেন, আমি নিজেও একটি কোম্পানীতে চাকুরী করি। গত দুই মাস ধরে বেতন পাইনি। এমনকি ঈদের বোনাসও পাইনি। সে কারনে কিস্তির টাকা দিতে পারিনি। তিনি আরও জানান, গতকাল যখন ওরা মাকে বাড়ি থেকে নিয়ে আসেন, তখন আমি ২/৩ দিনের সময় চেয়েছি কিন্তু তারা আমার কথা শোনেননি। ভেবেছিলাম হয়তো অফিসে নিয়ে গিয়ে তারা কথা বলে ছেড়ে দিবে। যখন ওরা আমাকে কল করে বলেছে, টাকা দিয়ে তোমার মাকে নিয়ে যাও, তখন থেকে আমি টাকার জন্য অনেকের কাছে গিয়েছি, টাকা পাইনি। বাধ্য হয়ে পরিবারের লোকজনসহ অন্যদের বিষয়টি জানাই। তারা আমার মাকে আটকে রেখে দীর্ঘ ৭ ঘন্টা ধরে মানসিক নির্যাতন করেছে। আজ টাকা না দিলে তার নামে মামলা দিয়ে পুলিশে দিবে বলেও জানান এনজিও’র লোকজন।
মাঠকর্মী জাহানারা বেগম বলেন, টাকার জন্য অনেকবার তার বাড়িতে গিয়েছি। অফিসে চাপ থাকায় আমি তাকে ডেকে এনে বড় স্যারকে অবগত করেছি। টাকা দিলে আমি নিজেই তাকে বাড়িতে পৌছে দিয়ে আসতাম। তার আগে আপনারা চলে আসছেন। বন্ধের দিনে কেন কিস্তি নিতে গেলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাস শেষ, টারগেট পুরুন করতে বন্ধ-ছুটি কিছুই মানা হয় না। এনজিওতে চাকুরি করেন তাহলেই বুঝতে পারবেন।
ভূক্তভোগী আলপোনা বেগম বলেন, পাঁচ বছর ধরে আমি তাদের এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কোনোদিন কিস্তি বকেয়া রাখিনি। গত দুই মাস ধরে ছেলের বেতন বন্ধ আছে, তাই কিস্তি দিতে পারিনি। এই জন্য ওরা আমাকে ধরে এনে অফিস ঘরে আটকে রেখে টাকার জন্য বারবার ছেলেকে কল দিচ্ছে। আমাকে বিভিন্ন ভাষায় গালিগালাজ করেছে। টাকা না দিলে আমাকে পুলিশে দিবে। ভয়ে আমি ছেলেকে বলেছি, টাকার ব্যবস্থা করে আমাকে নিয়ে যা বাবা। এরিয়া স্যার আমার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেছে। যা সহ্য করার মত না। মনে হচ্ছিল তখন আমি আত্মহত্যা করি। কিন্তু সবাই ছিল, তাই আত্মহত্যা করতে পারিনি।
এনজিও’র শাখা ব্যবস্থাপক আবু রায়হান বলেন, আসলে আমি এসবের কিছুই জানিনা। যা হবার হয়েছে, বাদ দেন ভাই। নিউজ করার দরকার নেই। আসলে বন্ধের দিনে তাকে নিয়ে আসা ঠিক হয়নি। তবে আমরা নিজেরাই তাকে বাড়িতে পৌছে দিতাম।
এরিয়া ব্যবস্থাপক মো. আরমান হোসেন সরকার বলেন, তাকে নিয়ে আসছিতো কি হয়েছে, টাকা দিলেই ছেড়ে দেওয়া হবে। আমরাও কমপক্ষে গত দুইমাসে দেড়’শ বারের অধিক তার বাড়িতে গিয়েছি, কই তখনতো আপনারা দেখেননি। আজ ঠিকই আসছেন। কয়েক কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে, হেড অফিস থেকে বারবার তাগাদা দিচ্ছে। আমরা বড় বিপদে আছি। পেটের দায়ে চাকরি করছি। বন্ধের দিনে কিস্তি আদায় করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এনজিওতে বন্ধ বা ছুটির দিন বলতে কোনো নিয়ম নেই। ওয়ান ওয়ে সার্ভিস।
কালাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামীম আরা বলেন, আমি ইউএনও নিজেও কাউকে আটকিয়ে রাখতে পারিনা। ঋণ দেওয়ার যেমন নিয়ম আছে, ঋণ আদায়েরও কিছু নিয়ম আছে। আদায় করতে না পারলে অবশ্যই আইনের সহায়তা নিতে পারতো। কিন্তু তা না করে কেন একজন নারীকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত আটকিয়ে রাখা হলো। ভূক্তভোগী অভিযোগ করলে অবশ্যই ওই এনজিও’র বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।