"পানির তলে ক্ষেতের ধান অহনো রইছে, কাটবার মানুষ পাই না ,
বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা মিঠামইন ও অষ্টগ্ৰামের বিভিন্ন হাওরে এখনো প্রায় দেড় শত হেক্টর জমি পানির তলে রয়েছে বলে কৃষকদের দাবি। সরকারি হিসেবে কৃষি অফিসের তথ্য মতে মিঠামইনে ৯৬ %ও অষ্টগ্ৰামে ৯৫ % ধান কর্তন হয়েছে। কিন্তু ভুক্তভোগী কৃষকরা বলছে অন্য কথা। তারা বলেন, পঁচা সহ ৮০ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। আজ শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত এই ৪ দিন মোটামুটি রোদ উঠলেও দুপুরের পর থেকে আবার বৃষ্টি বাতাস শুরু হয়েছে। হাওরের পানি কিন্তু কমছে না কারণ প্রতিটি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে পানি হাওরে প্রবেশ করছে । কৃষকরা জানান, হাওরের বিভিন্ন খাল খনন না হওয়ার ফলে এ সকল খাল এখন জমি হয়ে গেছে। অষ্টগ্রামের হাওরের একমাত্র জোয়াইরা খাল ও কাটা খাল বন্ধ হয়ে গেছে। এ দুটি খালের কারণে অধিকাংশ জমি এখনো পানির নিচে। মিঠামইনের চমোকপুরের কৃষক ইসলাম উদ্দিন ( সাবেক মেম্বার) জোয়াইরা হাওরে ৮ একর জমি করেছেন। তার জমি এখনো পানির নিচে। শ্রমিকের অভাবে কাটতে পারেনি। শুক্রবার সকালে চমোকপুরের হাওরের রাস্তায় দেখা হয় তার সাথে, তিনি বলেন, ৮ খানি ক্ষেত করছি সব ক্ষেত ওই পানির তলে । ক্ষেতের ধারে গাড়ি যায় না, ক্ষেত কাটবার দাওয়াল ও পাই না, আমার সব শেষ, আমি মাইনষেরে কইছি তোমরা আমার ক্ষেত কাইট্টা আধা লইয়া যাও , এরপরেও কেউ যায় না। ১ খানি ক্ষেত কাটলে ১ জন কামলারে ২৫০০ টেহা দেওন লাগবো ৬ জন কামলা লইলে ১৫ হাজার টেহা দেওন লাগবো। সারা বছরের খোড়াক, মহাজনের শোধের টেহা কইত্তেন দিমু । দেশ ছাইড়া যাওন ছাড়া কোন গতি নাই । সরকারের লিষ্টিতে নাম তুললে কি হইবো কয় টেহা পাইমু। সে আরো জানায়, তার আশেপাশে বেলাবরের আড্ডা, কাজাগড়িয়া, ও নদারের হাওরে এখনো শতাধিক একর জমি পানির নিচে রয়েছে। কাটার কোন ব্যবস্থা নাই । সরজমিনে জোয়ায়রা বিলে গিয়ে দেখা যায়, পানির তলে জমি তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সেখানে কথা হয় কয়েকজন ভুক্তভোগী কৃষকের সাথে, কাঞ্চন মিয়া নামক একজন কৃষক তার বাড়ি খলাপাড়া গ্ৰামে । তিনি বলেন, "১ খানি ক্ষেত করছি পানির তলে ক্ষেতের ধান অহনো রয়েছে,কাটবার মানুষ পাই না, একজন কামলারে ২৫০০ টেহা নাইলে তিন মন ধান দেওন লাগবো ক্ষেত কাটলে, এ ক্ষেত কাটলে কামলার টেহাও হয়তো না। সারাবছর কেমনে চলমু, ঋন করছিলাম ক্ষেত করবার সময়"। একই কথা বললেন কৃষক জিরন মিয়া, তিনি জোয়াইরা বিলে ৫ একর জমি করেছেন। এখনো পানির নিচে। একই হাওরের অপর কৃষক তাজিন মিয়া জানান, তিনি ৪ একর ৫০ শতাংশ জমি করেছেন। জমি লাগানো শুরু করে কাডার আগ পর্যন্ত ঋনের উপরে জমি করছি হেই জমি এখন পানির নিচে। মেশিনে ও কাডে না দাওয়ালরাও একজনে আড়াই হাজার টেহার কমে জমি কাটতো না। বল্লি বিলের কৃষক খলাপাড়া গ্ৰামের সালাউদ্দিন মিয়া বলেন, ৩ একর জমি পানির নিচে কাডার মতো কোন ব্যবেস্থা নাই । দিন রাইত খাইয়া না খাইয়া পইড়া রইছি হাওরে, জমি পাহারা দেওনের লাগি ,একমুট ভাতের লাগি । অপর কৃষক সালাউদ্দিনের সহোদর নাজমুল মিয়া জানান, কষ্টের ফসল পানির নিচে। সইতে পারতাছি না । ৯ একর জমি করছিলাম ৫ একর পঁচা রচা কাইট্টা নিচি। ৪ একর এহনো পানির তলে কাটবার চেষ্টা করতাছি । চমোকপুর সেচ স্কিমের ম্যানেজার, রুবেল মিয়া বলেন , জোয়াইরা বিলে ৪ একর জমি পানির নিচে রয়েছে মনে হয় আর কাটতে পারবো না। গাড়ি যায় না, হারভেস্টার ও যায় না। অন্যদিকে অষ্টগ্রামের সিমানায় জোয়ায়রা হাওরে ডিআইজির বাতান বলে একটি জায়গা রয়েছে। সেখানে এখনো ৫০ একর জমি পানির নিচে। কিছু কিছু জমি কৃষকরা নয়নভাগায় কাটছে ডিআইজির বাতানে একটি বাঁধ দিয়েছেন নিজের জমি রক্ষা করার জন্য। বাঁধের ভিতরেও পানি ঢুকে পড়ছে । নদার হাওরের ২ কৃষক কবির ও মজিদ মিয়া বলেন, ২ জনে ৪ একর জমি করছিলাম মহাজনের কাছ থেইক্কা শোধি টেহা আইন্না। এক মুট ধান ও কাটতাম পারছি না সব পানির তলে। অহন নিজে এই কি খাইমু কেমনে ঋন দিমু ,হেই চিন্তায় ঘুম হয়না। গরুর ও খাওন নাই । ৪ টা গরু বেইচ্চা দিমু । অষ্টগ্রাম উপজেলার কাস্তুল ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের বর্তমান ইউপি সদস্য খসরু মিয়ার সাথে অলওয়েদার সড়কে দেখা হয় তিনি বাতলা গ্ৰামের বাসিন্দা। তিনি বলেন, ২৫ একর জমি করেছেন মাত্র১৪ একর জমি কাটতে পেরেছেন। বাকি জমি পানির নিচে। এছাড়া খলায় পানি জমে কাটা ধানে ও গ্যাজ উঠে পড়েছে। অলওয়েদার সড়ক থাকাতে আমাদের ধান শুকাতে পারছি । আমাদের গ্ৰামটি সড়ক থেকে নিচু । এর জন্য খলায় পানি জমার কারণে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
মিঠামইন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওবায়দুল ইসলাম অপু বলেন, মিটামইনে প্রাথমিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় ৩ হাজার ৬ শত ৮৮ জনের নাম এসেছে । মোট ক্ষতি হয়েছে ৮ শত ৯৬ হেক্টর। কর্তন হয়েছে ৯৬ % তিনি আশা করছেন আবাহাওয়া অনুকূলে থাকলে শতভাগ কাটা শেষ হবে। কোন কোন জায়গায় কৃষি শ্রমিকের অভাবে তলিয়ে যাওয়া ধান কৃষকরা কাটতে পারছে না। পানির মধ্যে হারভেস্টার ও ধান কাটতে পারে না।
অষ্টগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অভিজিৎ পন্ডিত জানান, প্রাথমিক ভাবে ৬ হাজার ৯ শত ৯৪ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের নাম তালিকায় আসছে । এ পর্যন্ত ৯৫% ধান কাটা হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ মোট ৩ হাজার ১ শত ৭৪ হেক্টর জমি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ডাঃ সাদিকুর রহমান জানান, জেলার প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে । সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ইটনা ও অষ্টগ্ৰামে । মিঠামইনে ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কম ।