মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
সারাদেশ

রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: আমার দৃষ্টিভঙ্গি

অনলাইন ডেস্ক ২৮ July ২০২৬ · Tuesday · ০৯:০৬ অপরাহ্ণ
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: আমার দৃষ্টিভঙ্গি

জাহিন আবদুল্লাহ:

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ। রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধান হিসেবে দেশের ঐক্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সংবিধানের মর্যাদা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই এই পদে এমন একজন ব্যক্তির প্রয়োজন, যিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি রাষ্ট্র, সংবিধান, গণতন্ত্র ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে গভীর ধারণা রাখেন। আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিতে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এমন একজন রাজনীতিবিদ, যিনি রাষ্ট্রপতি পদের জন্য বিবেচিত হতে পারেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাজনীতির একজন পরিচিত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। তিনি ২৬ জানুয়ারি ১৯৪৮ সালে ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে পড়াশোনা করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৬০-এর দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও তিনি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

রাজনীতিতে আসার আগে তাঁর কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি। ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকা কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে সরকারি প্রশাসনেও দায়িত্ব পালন করেন। অর্থনীতি ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার এই সমন্বয় তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে ভূমিকা রেখেছে।

পরবর্তীতে তিনি সক্রিয় দলীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৮৮ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান শক্তিশালী হয়। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং তৎকালীন বিএনপি সরকারের সময়ে কৃষি এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতেও তাঁর দীর্ঘ পথচলা রয়েছে। ২০০৯ সালে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। ২০১১ সালে তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান এবং ৩০ মার্চ ২০১৬ সালে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২৬ সালেও তিনি বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন—বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের দলীয় তথ্যেও তাঁকে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আমার কাছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচনা করার অন্যতম কারণ তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। একজন রাষ্ট্রপতির জন্য শুধু দলীয় রাজনীতির অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংকট, সংসদীয় রাজনীতি এবং জনগণের বিভিন্ন প্রত্যাশা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। মির্জা ফখরুল দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত। ফলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাঁর অভিজ্ঞতা একটি সম্ভাব্য যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

আরেকটি বিষয় হলো তাঁর শিক্ষাগত ও পেশাগত পরিচয়। অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা এবং শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা একজন রাজনীতিবিদের চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণী সক্ষমতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থনীতি একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য, বৈষম্য, বাজেট, বিনিয়োগ ও জনকল্যাণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে অর্থনীতি সম্পর্কে তাঁর শিক্ষাগত ভিত্তি রাষ্ট্রীয় নীতি ও জাতীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

তবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পাশাপাশি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে কাজ করার মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যদি কখনো এই পদের জন্য বিবেচিত হন, তাহলে তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সব রাজনৈতিক মত ও জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য একজন সাংবিধানিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা।

আমার দৃষ্টিতে, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর সম্ভাব্য ভূমিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা। বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিভাজন দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হতে পারে রাজনৈতিক সহনশীলতা, সংলাপ, সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখা। একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে মির্জা ফখরুল যদি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতাকে জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগানোর সুযোগ থাকতে পারে।

তবে একজন রাষ্ট্রপতির যোগ্যতা নির্ধারণে শুধু ব্যক্তিগত পছন্দ যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের একটি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়া রয়েছে। তাই কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চাইলে তাঁর ব্যক্তিগত যোগ্যতার পাশাপাশি সাংবিধানিক বিধান, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং জাতীয় ঐকমত্যের বিষয়গুলোও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন সমর্থন রয়েছে, তেমনি তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এটি স্বাভাবিক। একজন সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর মূল্যায়ন করতে হলে শুধু দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে নয়; বরং তাঁর সততা, নিরপেক্ষতা, সাংবিধানিক মূল্যবোধ, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের সব নাগরিকের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি—এসব বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে।

সবশেষে বলতে চাই, আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মতো একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, সংসদীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘদিন বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তাঁকে একটি সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আনার ভিত্তি তৈরি করে।

তবে রাষ্ট্রপতি পদটি কোনো দল বা ব্যক্তির একক সম্পত্তি নয়; এটি পুরো রাষ্ট্রের একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। তাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চাইলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা হবে—তিনি যেন দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশের সব নাগরিকের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, সংবিধানের প্রতি অটুট থাকেন, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনকে সমুন্নত রাখেন এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। আমার কাছে এমন একজন রাষ্ট্রপতিই হবেন সত্যিকারের ‘জনগণের রাষ্ট্রপতি’।

লেখক: জাহিন আবদুল্লাহ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

আরও পড়ুন

কিশোরগঞ্জে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ভেজাল খাদ্যপণ্য ধ্বংস

কিশোরগঞ্জে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ভেজাল খাদ্যপণ্য ধ্বংস

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় শাহাব উদ্দিন ফুড প্রডাক্টস নামক একটি প্রতিষ্ঠানে...

২৬ October ২০২৬ · Monday · ০২:৫৪ অপরাহ্ণ
মারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কামরুল ইসলামের নির্বাচনি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

মারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কামরুল ইসলামের নির্বাচনি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নের বিন্নাগ...

২৫ October ২০২৬ · Sunday · ০৫:২৫ অপরাহ্ণ
ছোট ভাই আলমগীরই হত্যা করায় বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরকে,সংবাদ সম্মেলনে দাবি নিহতের স্ত্রীর

ছোট ভাই আলমগীরই হত্যা করায় বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরকে,সংবাদ সম্মেলনে দাবি নিহতের স্ত্রীর

বিজয় কর রতন,কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আল...

২৪ October ২০২৬ · Saturday · ০৯:০০ অপরাহ্ণ
মিঠামইনে বিএনপির সভাপতি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা

মিঠামইনে বিএনপির সভাপতি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা

বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার বিএনপির সভাপতি এডভোকেট জাহি...

২৪ October ২০২৬ · Saturday · ০৮:০৫ অপরাহ্ণ