ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ: প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর, ভারতের উদ্বেগ ও বাংলাদেশের ‘ভারসাম্যমূলক কূটনীতি’
মোঃ রাকিব হাসান:
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফর দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন এবং সুদূরপ্রসারী সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। গণতান্ত্রিক পটপরিবর্তনের পর এটিই ছিল তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় সফর, যার দ্বিতীয় ধাপে তিনি চীনের শীর্ষ নেতৃত্ব—প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং(Xi Jinping ) এবং প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের (Li Qiang ) সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক সম্পন্ন করেছেন।
এই সফরের মধ্য দিয়ে ঢাকা ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক কেবল এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়নি, বরং দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৭টি সমঝোতা স্মারক এবং ১৪ দফার যৌথ ইশতেহার একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। বার্তাটি হলো—বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত প্রয়োজনে কোনো নির্দিষ্ট শিবিরের দিকে ঝুঁকে না পড়ে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ এবং 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। তবে ঢাকার এই বেইজিং-মুখী কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা নয়াদিল্লির জন্য গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুই দেশের বর্তমান কৌশলগত টানাপোড়েনের মূল বিন্দুটি লুকিয়ে আছে বহুল আলোচিত 'তিস্তা নদী মহাপরিকল্পনা' এবং মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন প্রকল্পের মধ্যে। কয়েক দশক ধরে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মারপ্যাঁচে আটকে থাকা তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি যখন আলোর মুখ দেখছে না, তখন বাংলাদেশের উত্তর জনপদের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঠেকাতে বিকল্প পথ খোঁজা ঢাকার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।
এই সফরে চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রী লি গুওইং স্বয়ং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, নদী শাসন, ড্রেজিং এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে বেইজিংয়ের সরাসরি সম্পৃক্ততা ও কারিগরি সহায়তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। ভারতের কৌশলগত বিশ্লেষকদের মতে, শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’—যা ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে যুক্ত করেছে—তার এত কাছাকাছি চীনের মতো একটি পরাশক্তির অবকাঠামোগত উপস্থিতি ভারতের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি। একই সঙ্গে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নে চীনের অংশগ্রহণ ভারত মহাসাগরে বেইজিংয়ের প্রভাব বৃদ্ধির অংশ হিসেবে দেখছে দিল্লি।
ভারতীয় গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলে বাংলাদেশের এই পদক্ষেপ নিয়ে যে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, তা অমূলক নয়। কিন্তু বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে ভূ-রাজনৈতিক তাস খেলা নয়, বরং নিজেদের অর্থনৈতিক টিকে থাকার লড়াই।
বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত 'ইনভেস্ট বাংলাদেশ' সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশ আনোয়ারা ও মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন এবং দেশে প্রথম ইনভেস্টমেন্ট অফিস স্থাপনের মাধ্যমে বিপুল চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চায়। দীর্ঘদিন ধরে স্থবির থাকা দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট কাটাতে চীনের এই অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বাংলাদেশের জন্য এই মুহূর্তে এক বড় ট্রাম্পকার্ড।
তবে এই সফরের সাফল্যের সমান্তরালে বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্যও বজায় রাখতে হচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক প্রভাবকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ বাংলাদেশের নেই। বাংলাদেশ সবসময়ই ভারতের বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগকে সম্মান জানিয়ে আসছে এবং এই প্রতিশ্রুতি বজায় রেখেছে যে, বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে কখনো ভারতের বিরুদ্ধে কোনো শত্রুতামূলক কাজে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। অতি সম্প্রতি ভারতের পক্ষ থেকে পর্যটন ভিসা (ট্যুরিস্ট ভিসা) পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত এবং কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয় যে, দিল্লিও ঢাকার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
পরিশেষে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর প্রমাণ করেছে যে, বাংলাদেশ এখন আর কারও একচেটিয়া প্রভাব বলয়ের অধীন নয়। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজের জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে বৈশ্বিক অংশীদারদের বেছে নেবে। দিল্লির প্রথাগত একপেশে প্রভাব বিস্তারের নীতি পরিহার করে ভারতকে এখন সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং তিস্তার ন্যায্য পানিবণ্টন ও সীমান্ত হত্যা বন্ধের মতো দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সংকটগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান করতে হবে। কেবল একটি মর্যাদাপূর্ণ ও সমতাভিত্তিক দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিই পারে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদি আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে, যেখানে বাংলাদেশের সার্বভৌম উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা কোনো আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার বলি হবে না।
লেখক: মোঃ রাকিব হাসান
শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।