ঈদের ছুটিতে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে পর্যটকে ঠাসা
এইচ এম ফরিদুল আলম শাহীন, কক্সবাজার //
ঈদুল আজহার ছুটি ঘিরে শুরুতে কিছুটা শঙ্কা থাকলেও ঈদের দ্বিতীয় তৃতীয় দিন থেকে দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারে ফিরতে শুরু করেছে প্রাণচাঞ্চল্য।
শনিবার (৩০ মে) বিকেলের দিকে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে দেখা গেছে দর্শনার্থীদের ঢল। সমুদ্রের গর্জন, প্রচন্ড গরম বাতাস সত্ত্বেও পর্যটকেরা থেমে নেই। সব বিরূপ প্রকৃতি উপেক্ষা করে অপরূপ সূর্যাস্ত উপভোগ করতে পরিবার-পরিজন নিয়ে সৈকতে ভিড় করছেন দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা লাখো পর্যটক।
সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী,দরিয়া নগর, হিমছড়ি, ইনানী,পাটোয়ারটেক ও টেকনাফ সমুদ্র সৈকতের জিরো পয়েন্টে দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের উপস্থিতি। কেউ সমুদ্রস্নানে মেতেছেন, কেউবা বালুচরে হেঁটে সময় কাটাচ্ছেন। অনেকে আবার স্মার্টফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে ঈদের আনন্দের মুহূর্তগুলো স্মরণীয় করে রাখছেন।
বাইরের পর্যটকদের সাথে মিশে গেছে স্থানীয় শিশু,কিশোর, কিশোরী এবং বয়স্ক লোকজন। সকলে স্বজনের নিয়ে সমুদ্র সৈকতে পড়ন্ত বিকালের সমুদ্রের গর্জন আর সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখতে শুধু মিছিলের সারি। গন্তব্য সমুদ্র সৈকত।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘ ছুটি থাকা সত্ত্বেও এবার আগাম বুকিং প্রত্যাশার তুলনায় কম ছিল। কারণ ঈদের সরকারি ছুটির বড় অংশ সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলে যাওয়ায় অনেকেই সংক্ষিপ্ত সফরের পরিকল্পনা করেন। তবে ঈদের দিন পেরিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। বর্তমানে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলোতে বুকিং বাড়ছে এবং আগামী কয়েক দিনে আরও বেশি পর্যটক আসার আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।কারণ ঈদের ছুটিতে কোরবানির কর্মযজ্ঞ শেষ করে সবাই চায় একটু নিরিবিলি পরিবেশে সমুদ্রের বিশালতার সাথে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে। স্বচ্ছ আলোতে, নির্মল বাতাসে সাগরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে।তাই আগামী এক সপ্তাহ কক্সবাজার পর্যটনে ভরপুর থাকবে বলে জানিয়েছেন পর্যটন বান্ধব ব্যবসায়ীরা।
এদিকে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে কক্সবাজারের বিভিন্ন হোটেলে নানা ধরনের জুস, ফুড ফেস্টিভ্যাল আয়োজন করেছে। সেখানে মৌসুমি নানা ফল দিয়ে তৈরি বিশেষ সব খাবার ও ডেজার্ট উপভোগের সুযোগ পাচ্ছেন পর্যটকরা।
ঢাকার শ্যমলী থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘুরতে আসা পর্যটক আনাস মিঞা বলেন, “শহরের কর্মব্যস্ত জীবন থেকে কিছুটা স্বস্তি পেতে ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে এসেছি। বিকেলের সমুদ্র আর পরিবেশ সত্যিই মনকে প্রশান্ত করে।”
পাবনা থেকে আসা ব্যাংকার লাবণী সরকার ও কলেজশিক্ষার্থী জান্নাত জিশান বলেন, “বন্ধুদের সঙ্গে প্রথমবার কক্সবাজারে ঈদের ছুটি কাটাচ্ছি। সৈকতের পরিবেশ এবং মানুষের উচ্ছ্বাস দেখে খুব ভালো লাগছে।”
চট্টগ্রাম থেকে আসা ব্যবসায়ী নুরুল কবির বলেন, “আগে ভেবেছিলাম পর্যটক কম থাকবে। কিন্তু বিকেলে সৈকতে এসে দেখি মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি। ঈদের আমেজটা এখানেই বেশি অনুভব করছি।”
সৈকতে দায়িত্ব পালনরত সি-সেইফ লাইফগার্ডের সুপারভাইজার মুহাম্মদ ওসমান বলেন, “পর্যটকদের নিরাপদ সমুদ্রস্নান নিশ্চিত করতে আমাদের সদস্যরা বিভিন্ন পয়েন্টে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। সবাইকে নির্ধারিত এলাকার মধ্যে থেকে গোসল করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।”
ট্যুরস অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুয়াক)-এর সভাপতি আনোয়ার মোস্তফা বলেন, “আগাম বুকিং খুব বেশি না থাকলেও ঈদের পর থেকে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। আগামী কয়েক দিনে পর্যটন খাতে আরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আমরা আশা করছি।”
কক্সবাজার হোটেল-গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, “ছুটির কাঠামোর কারণে এবার পর্যটক আসার সময় কিছুটা সীমিত হয়েছে। তারপরও কক্সবাজারে কয়েক দিনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পর্যটকের সমাগম ঘটবে বলে আমরা মনে করছি। অধিকাংশ আবাসিক হোটেলেই এখন বুকিং বাড়ছে।”
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের সদ্য বদলি আদেশ পাওয়া পুলিশ সুপার নাহিদ আদনান তাইয়ান বলেন, “ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। সৈকতের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ছাড়াও ইনানী, হিমছড়ি ও পাটোয়ারটেক এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
গুড়িগুড়ি বৃষ্টি, মেঘলা আকাশ কখনো বৃষ্টি, কখনো রোদ সমুদ্রের বিকট গর্জন আর মাঝে মাঝে ধমকা শীতল হাওয়ায় পর্যটকদের আনন্দ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। কক্সবাজার বীচ ম্যানেজম্যান কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান বলেন,সমুদ্র সৈকত ও পার্শ্ববর্তী পর্যটন বিচরণ এলাকায় নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে, র্যাব, পুলিশের পাশাপাশি সেনা টহল জোরদার করা হয়েছে। কোন হোটেল, রেস্তোরাঁ, যাত্রীবাহী গাড়ির কাউন্টার কিংবা যেকোন ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্টানের বিরুদ্ধে পর্যটক হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেলে সাথে সাথে ভ্রাম্যমান ম্যাজিস্টেট সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সাজা জরিমানা করার নির্দেশ দেয়া আছে।আর কোন পর্যটক যদি হয়রানির শিকার হন তা হলে প্রতিটি পয়েন্টে হেল্পডেক্স যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা যাচ্ছে।