বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী কেল্লাপোষী মেলা
আমাদের দেশে গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মেলা। হরেক রকমের তৈজসপত্র, বিনোদন ব্যবস্থা, মুখরোচক খাবার, শৌখিনতা এবং নানা শ্রেণির মানুষের আনাগোনায় মুখরিত এক উৎসব-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জমে ওঠে গ্রামীণ মেলা। প্রায় ৪৭০ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে গত রবিবার থেকে ৩ দিনব্যাপী বগুড়ার কেল্লাপোষী মেলা শুরু হয়। প্রতি বছর জৈষ্ঠ্য মাসের দ্বিতীয় রোববার এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। বগুড়ার শেরপুর উপজেলা থেকে নন্দীগ্রাম রোডে ৩ কিলোমিটার পশ্চিম দিকে গেলে কেল্লাপোষী নামক এলাকায় এ মেলা দেখা যায়। আমার শৈশবের অনেক স্মৃতি রয়েছে এ মেলাকে ঘিরে। ছোটবেলায় মামার সাথে এ মেলাতে যেতাম। মেলায় গিয়ে পেটপুরে মিষ্টি, সন্দেশ খেতাম। নাগরদোলায় চড়ে হৈ-হুল্লোড়ের মজাই ছিল আলাদা। সার্কাস, জাদুখেলা দেখে চোখ জুড়িয়ে যেত। কিন্তু বড় হয়ে এখন আর মেলাকে ঘিরে সেই উচ্ছ্বসিত অনুভূতি নেই। আমি বর্তমানে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। নানা কারণে অনকে বছর ধরেই মেলায় যাওয়া হয় না। এবছর ঈদের ছুটে পড়েছে মেলার মধ্যে। তাই মেলায় যাওয়ার সুযোগটা আর হাতছাড়া করলাম না। মেলার দ্বিতীয় দিন আমি, আর আমার ফুফাতো ভাই মিলে রওনা দিলাম মেলার উদ্দেশ্যে। দুপুরের পরপরই রওনা দিয়েছিলাম, তাই মেলার রাস্তায় তেমন ভিড় ছিল না। মেলার রাস্তাটা ঠিক আগের মতোই আছে। ভাঙা রাস্তায় বৃষ্টির জল জমে যাতায়াতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। সেখানে প্রায় শতাধিক কারখানা থাকা সত্ত্বেও রাস্তার এমন খারাপ অবস্থা মোটেই কাম্য নয়। যাইহোক, মেলার কাছাকাছি যেতেই নাগরদোলার হৈ-হুল্লোড়, আর সার্কাসের মাইকের শব্দ শুনতে পেয়ে মনের মধ্যে রোমাঞ্চ অনুভব করলাম। মেলার শুরুতেই রাস্তার দুপাশে সারি সারি মাটির পুতুল, হাঁড়ি-পাতিল ও নানা রকমের খেলনার দোকান বসেছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে রং-বেরঙের বেলুন নিয়ে বাবার হাত ধরে মেলায় ঘোরাঘুরি করছে। সার্কাস খেলায় জাদু ও শারীরিক কসরতের ভেলকিবাজি দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলো। এছাড়াও মেলায় এসেছে মোটরসাইকেল ও মাইক্রো গাড়ি খেলা। খানিক দূরে আকাশের দিকে চাইতেই দেখি নানা রঙের, নানা আকারের ঘুড়ি উড়ছে। পাশেই দেখি ঢোল, বাঁশি বিক্রি করছে এক লোক। মৃৎশিল্পের নানা তৈজসপত্র দেখলাম এক দোকানে। কাঠের তৈরি খাট, দরজা, জানালা সহ নানা তৈজসপত্র বিক্রি হচ্ছে এ মেলায়। মেলার এক পাশে বসেছে প্রায় ১০ থেকে ২০ কেজি ওজনের বড় বড় সব মাছের দোকান। মৌসুমি ফল হিসেবে মেলায় প্রচুর লিচু বিক্রি হচ্ছে। এক দোকানে দেখলাম প্রায় চল্লিশ প্রকারের আচার বিক্রি করছে। কর্দমাক্ত রাস্তার কারণে রসগোল্লার দোকানের দিকে যাওয়ার সুযোগ হলো না। তবে লোকমুখে শুনলাম, হরেক রকমের বাহারি মিষ্টি আছে সেসব দোকানে। বগুড়ার বিখ্যাত দই ও মহাস্থানের সুস্বাদু কটকটির দোকানও বসেছে মেলায়। মেলা উপলক্ষ্যে জামাই দাওয়াত করে আনে শশুর বাড়ির লোকজন। মেলায় কেনাকাটার জন্য জামাইকে সালামি দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে এখানে। মেলা থেকে মাছ, মিষ্টি কিনে নিয়ে জামাই শশুর বাড়ি যায়। তাই স্থানীয়রা এ মেলাকে 'জামাই মেলা' বলে থাকেন।
কালের বিবর্তনে এ মেলার ঐতিহ্যবাহী অনেক কিছু হারিয়ে গেছে। বসতবাড়ি ও কারখানা বেড়ে যাওয়ার কারণে মেলার জায়গা স্বল্পতা তৈরি হয়েছে অনেক। আগের মতো লোকজনও আসে না মেলায়। ছোটবেলায় নিজেই দেখেছি, মানুষ মাটির হাঁড়ি, কলস ভর্তি করে রসগোল্লা কিনে নিয়ে যেতো এ মেলা থেকে। অনেক আগেই হারিয়ে গেছে বায়স্কোপ খেলা। ঘোড়ার গাড়িতে মেলায় যাতায়াত করতো লোকজন। প্রবীণ ব্যক্তিদের কাছে শোনা যায়, মানুষ পালকিতে চড়েও এ মেলায় যাতায়াত করতো। এসবের কিছুই এবার মেলায় দেখলাম না। তবে আধুনিক কিছু বিনোদন ব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে এ মেলায়। রোলার কোস্টারে চড়ে শিশুদের উন্মাদনা চোখে পড়ার মতো। থ্রি-ডি আ্যানিমেশন গেমসের অভিজ্ঞতাও নিতে পারছে গ্রামের সহজ-সরল মানুষেরা। যান্ত্রিকতার যুগে আমাদের দেশের গ্রামীণ মেলা ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। গ্রামীণ মেলা বাংলা সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। আগামী দিনে গ্রামীণ মেলা টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন।
লেখক,
মো. জাহিদ হাসান
শিক্ষার্থী,
বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।