বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঐতিহাসিক শোলাকিয়ায় দেশের বৃহত্তম পবিত্র ঈদ-উল-আযহার ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত
কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:
বৈরি আবহাওয়ার মধ্যেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে দেশের সর্ববৃহৎ পবিত্র ঈদুল আযহার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃ্হস্পতিবার (২৯ মে) সকাল ৯ টায় এই ঈদগাহে ১৯৯ তম পবিত্র ঈদুল আযহার ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে।এতে ইমামতি করেন আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে ইমামতি হারানো জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওয়ালীউল্লাহ রাব্বানীর সহোদর ভাই মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ।
বড় ঈদগাহ, বড় জামাত। বেশি মুসল্লির সঙ্গে জামাত আদায় করলে দোয়া কবুল হয়-এমন আকর্ষণে সকাল থেকেই এই ঈদ জামাতে নামাজ আদায়ের জন্য কিশোরগঞ্জ ও আশপাশের জেলাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন মুসল্লিরা।এছাড়াও দূর-দূরান্তের মুসল্লিদের ঈদগাহ মাঠে আসার সুবিধার্থে ঈদের দিন সকালে ময়মনসিংহ ও ভৈরব থেকে দুইটি স্পেশাল ট্রেন যাতায়াত করে।ঈদের নামাজ শেষে মোনাজাতে মুসলিম উম্মাহ দেশ ও জাতীয় কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনায় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ।
ঈদ জামাতে উপস্থিত ছিলেন-কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম,জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান,জেলা পরিষদের প্রশাসক ভিপি খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল সহ সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও সুধীজন।এদিকে ঈদগাহ ময়দানকে ঘিরে গড়ে তোলা হয় চার স্তরের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শহর এবং আশপাশের এলাকায় বাড়ানো হয় গোয়েন্দা নজরদারি। ঈদের জামাতকে কেন্দ্র করে সাদা পোশাকে ও পুরো পোশাকে অফিসার ফোর্স মোতায়েন করা হয়।এছাড়াও র্যাবের টিম (প্রতি টিমে ছয়জন করে) ও বিজিবি সদস্য মোতায়েন ছিল। পুরো মাঠ পর্যবেক্ষণের জন্য বসানো হয়েছিল চারটি ওয়াচ টাওয়ার। এ ছাড়া সেনাবাহিনী, এপিবিএন এবং বিজিবি ও র্যাব মোতায়েন ছিল। পুরো মাঠ নজরদারির জন্য ড্রোন ওড়ে শোলাকিয়ায়। মাঠের বিভিন্ন প্রান্তে বসানো হয়েছিল ১৩টি আর্চওয়ে। বসানো হয়েছিল সিসি ক্যামেরা। এ ছাড়া আনসার সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা থেকে এসেছিল বোম ডিসপোজাল টিম। ছিল ছয়টি অ্যাম্বুলেন্সসহ তিনটি মেডিকেল টিম। দায়িত্ব পালন করছেন ১০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।৪ টি ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন ও সিসি ক্যামেরা ছাড়াও ড্রোন ঈদগাহের ভেতর ও বাহিরের এলাকায় সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে নিয়োজিত ছিল।ঈদগাহ ময়দানে মুসল্লিদের প্রবেশের জন্য মোট ২৩টি ফটকের মধ্যে ৫টি ফটকের প্রবেশপথ উন্মুক্ত রাখা হয়। এসব প্রবেশপথে স্থাপিত আর্চওয়ে দিয়ে মুসল্লিরা শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে ঈদগাহে প্রবেশ করেন।
এর আগে তিন দফা মেটাল ডিটেক্টরে সবার দেহ তল্লাশি করা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে মুসল্লিদের কোনো ধরনের ব্যাগ নিয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। নিরাপত্তার স্বার্থে শুধু মোবাইল ও জায়নামাজ নিয়ে ঈদগাহ মাঠে ঢুকতে দেওয়া হয়।
এদিকে শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে অংশগ্রহনের সুবিধার্থে ভৈরব-কিশোরগঞ্জ-ভৈরব ও ময়মনসিংহ- কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ লাইনে ‘শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল' নামে দুটি স্পেশাল ট্রেন চলাচল করে।শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল-১ ভৈরব থেকে ছাড়ে সকাল ৬ টায় কিশোরগঞ্জ পৌঁছে সকাল ৮টায়,আবার শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল -১ কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে যায় দুপুর ১২টায় ভৈরব পৌঁছে দুপুর ২টায়।শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল -২ ময়মনসিংহ থেকে ছাড়ে সকাল পৌনে ৬টায় কিশোরগঞ্জ পৌঁছে সকাল সাড়ে ৮টায়, আবার শোলাকিয়া ঈদ স্পেশাল -২ কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে যায় দুপুর ১২টায় এবং ময়মনসিংহে পৌঁছে বেলা ৩টায়।
শোলাকিয়া মাঠের রেওয়াজ অনুযায়ী, ঈদের জামাত শুরুর আগে শর্টগানের ৬টি ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। জামাত শুরুর ৫ মিনিট আগে ৩টি, ৩ মিনিট আগে ২টি এবং ১ মিনিট আগে ১টি গুলি ছুড়ে নামাজের জন্য মুসল্লিদের সঙ্কেত দেয়া হয়।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ইসলামের ঐশী বাণী প্রচারের জন্য সুদূর ইয়েমেন থেকে আগত শোলাকিয়া 'সাহেব বাড়ির' পূর্বপুরুষ সুফি সৈয়দ আহমেদ তার নিজস্ব তালুকে ১৮২৮ সালে নরসুন্দা নদীর তীরে ঈদের জামাতের আয়োজন করেন। ওই জামাতে ইমামতি করেন সুফি সৈয়দ আহমেদ নিজেই। অনেকের মতে, মোনাজাতে তিনি মুসল্লিদের প্রাচুর্যতা প্রকাশে 'সোয়া লাখ' কথাটি ব্যবহার করেন। আরেক মতে, সেদিনের জামাতে ১ লাখ ২৫ হাজার (অর্থাৎ সোয়া লাখ) লোক জমায়েত হয়। ফলে এর নাম হয় 'সোয়া লাখি' । পরবর্তীতে উচ্চারণের বিবর্তনে শোলাকিয়া নামটি চালু হয়ে যায়।আবার কেউ কেউ বলেন, মোগল আমলে এখানে অবস্থিত পরগনার রাজস্বের পরিমাণ ছিল সোয়া লাখ টাকা। উচ্চারণের বিবর্তনে সোয়া লাখ থেকে সোয়ালাখিয়া_ সেখান থেকে শোলাকিয়া। পরবর্তিতে ১৯৫০ সালে স্থানীয় দেওয়ান মান্নান দাদ খাঁ এই ময়দানকে অতিরিক্ত ৪.৩৫ একর জমি দান করেন।বর্তমান শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের আয়তন ৭ একর। নরসুন্দা নদীর তীরে শোলাকিয়ার অবস্থান। বর্তমানে শোলাকিয়ার পূর্বপ্রান্তে দু'তলা একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এই ঈদগাহ মাঠটি চারপাশে উচু দেয়ালে ঘেরা হলেও মাঝে মাঝেই ফাঁকা রাখা হয়েছে যাতে মানুষ মাঠে প্রবেশ ও বের হতে পারে। এছাড়া এই মাঠের প্রাচীর দেয়ালে কোনো দরজা নেই।তবে এবার জেলা পরিষদের উদ্যোগে ফটক নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে।শোলাকিয়া মাঠে ২৬৫ সারির প্রতিটিতে ৫০০ করে মুসল্লি দাঁড়াবার ব্যবস্থা আছে। ফলে মাঠের ভেতর সবমিলিয়ে এক লাখ বত্রিশ হাজার ৫০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন।তবে ঈদ-উল আযহায় মুসল্লীদের সমাগত কম হলেও ঈদুল ফিতরের সময় দেখা যায়, আশপাশের সড়ক, খোলা জায়গা, এমনকি বাড়ির উঠানেও নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। এভাবে সর্বমোট প্রায় তিন লাখ মুসল্লি ঈদের নামাজ পড়ে থাকেন। এবং এই মুসল্লির এই সংখ্যা প্রতিবছর বেড়ে চলেছে।