স্মৃতির পাতায় ববি শিক্ষার্থীদের শৈশবের ঈদ
আবদুল্লাহ আল শাহিদ খান, ববি প্রতিনিধি,
শৈশবকালের ঈদের যে আনন্দ অনুভূতি সেটা বয়স বাড়ার সাথে সাথে কমতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে একজন শিক্ষার্থীর কাছে ঈদ মানে এখন আর কেবলই নতুন পোশাকের আনন্দ নয় । বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ছেড়ে আপন নীড়ে ফেরলেও , ছোটবেলার ঈদের উদ্দিপনা ও অনুভূতি তাদের মধ্যে থাকে না । ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে যখন কোনো শিক্ষার্থী বাড়ির পথ ধরে তখন তার ব্যাগে শুধু কিছু পোশাক থাকে না, সাথে থাকে মাসের পর মাস জমে থাকা ক্লান্তি, অজস্র গল্প আর প্রিয়জনদের কাছে ফেরার এক তীব্র আকুলতা।
এই বিষয়ে নিয়ে কথা হয়েছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে শুনবো ছোট বেলার ঈদ স্মৃতিকে কেন্দ্র করে তাদের আবেগ-অনুভূতি আর প্রিয়জনদের প্রতি ভালোবাসার গল্প।
২০২৩-২৪ সেশনের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মোহাম্মদ মারুফ হাওলাদার বলেন,
" ছোটবেলায় ঈদের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। কখন আত্মীয়দের বাসায় যাব, কখন নতুন জামা পরব—এসব ভাবনায় মন ভরে থাকত আনন্দে। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন সেই উৎসাহ অনেকটাই হারিয়ে গেছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কারণে ঈদের ছুটিতেও বাড়ি যাওয়া হয় না; ঈদ কাটে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলেই। আসলে ঈদের আনন্দ আজও আছে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অনুভূতি আর উৎসব উদ্যাপনের ধরন বদলে যায়।"
২০২২-২৩ সেশনের লোকপ্রশাসন বিভাগের মুজাহিদুল ইসলাম নাহিদ বলেন,
" ছোটবেলার ঈদ ছিল একটু আলাদা। তখন কাজ ছিল বড়দের থেকে সালামি উশুল। আর আপনজনের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ খবর নেয়া। দিনকে দিন ঈদুল আজহার ত্যাগের বার্তাকে নিজের মধ্যে লালন করা শিখছি । নিজস্ব ভোগ কিংবা প্রবৃত্তিকে দমন করে সামষ্টিক সুখের চিন্তা চর্চার পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয় এই দিনটি। বছরের এই একদিন সারাবছর মানবকল্যানে আর্ত মানবতার পাশে দাড়ানোর প্রশিক্ষণ কর্মশালা। সবমিলিয়ে দায়বদ্ধতা নামে যে বাস্তব আবর্তে মানুষকে ঘুরতে হয়, তা অনুমেয় হচ্ছে।"
২০২৩ -২৪ শিক্ষাবর্ষের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মোঃ জুয়েল আহম্মদ এই বিষয়ে জানতে চাইলে একই ভাবে। তিনি বলেন,
" ছোট্ট বেলার ইদের অনুভূতি টা ছিল আবেগ প্রবণ
ফজরের নামাজের পর সবাই মিল নদীতে গোসল ছেড়ে নতুন পোশাক পড়ে বাবা মার কাছে ৪০ টাকা এক বছরান্তে এর চাহিদা বেড়ে যেতে
কিন্তু এখন আর শৈশবের ইদের আমেজ আর পাই না। আসলে মানুষ যত বড়ো হয় আনন্দ অনুভূতি জীবন থেকে বিলীন হয়। "
২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে কোস্টল এন্ড ম্যানেজমেন্ট স্টেডিস এর খন্দকার মোহাম্মদ রেজওয়ান বলেন,
" ছোট বেলাতে ঈদ মানেই বুঝতাম হৈ-হুল্লো, বাজি ফাটানো, মজার মজার খাবার খাওয়া আর ঈদ সালামি পাওয়া,পুরোটাই ছিলো উচ্ছাস। আর এখন,,,বড় হবার পরে, চাতক পাখির মত চেয়ে থাকি , কবে ছুটি পাব? কবে বাড়ি যাব? কখন সবার সাথে ঈদ উদযাপন করব? পুরোটা জুড়েই এখন আবেগ !"
২০২৩ -২৪ সেশনের ইতিহাস বিভাগের মোহাম্মদ শিহাব উদ্দিন বলেন,
" ছোটোবেলার ঈদ ছিল নতুন জামার গন্ধ, সালামির খুশি আর একরাশ নির্ভেজাল উচ্ছ্বাসের নাম।
চাঁদ রাতের উত্তেজনা আর ঈদের সকালের হাসি যেন পুরো পৃথিবীটাকেই আনন্দে ভরে দিত। বড়োবেলায় এসে এখন ঈদ আর শুধু উৎসব নয়, এটা হয়ে উঠেছে অনুভূতি, স্মৃতি আর আপন মানুষদের কাছে পাওয়ার এক গভীর উপলব্ধি। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, তবুও হৃদয়ের ভেতর ছোটোবেলার সেই ঈদ আজও নীরবে সবচেয়ে সুন্দর হয়ে বেঁচে আছে।
তবে অনেকের কাছে বয়স একটি সংখ্যা মাত্র। তাদের ঈদ আনন্দগুলো এখনো রয়ে গেছে আগের মতই। বাড়তি দ্বায়িত্ব আর জীবন চিন্তা তাদের এই ঈদ আনন্দে যোগ করে আরো এক নতুন মাত্রা।
২০২২-২৩ সেশনের গনযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাদিয়া আক্তার তার ছোট বেলা ইদের সাথে বড়বেল ইদ উদযাপন সম্পর্কে বলেন,
"ছোটবেলার ঈদ মানেই ছিল নতুন জামা-কাপড়, আগের রাতে ঘুম না হওয়া, সকালে সবার হাতের মেহেদী দেখা আর সারাদিন ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব বেড়েছে, ঈদের আনন্দের ধরণও বদলে গেছে। এখন পরিবারের সবাই একসঙ্গে হওয়াটাই ঈদের সবচেয়ে বড় আনন্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মো : তানজিম হাসান জিহাদ
বলেন,
" ছোটোবেলার ঈদ ছিল নতুন জামা, সালামি আর সারাদিনের আনন্দে ভরা এক উচ্ছ্বাস।
আর বড়োবেলার ঈদ যেন দায়িত্ব, স্মৃতি আর প্রিয় মানুষদের অনুভূতির এক অন্যরকম গল্প।
সময় বদলেছে, ঈদের আনন্দের ধরনও বদলেছে—তবুও ঈদ মানেই হৃদয়ে নাড়া দেওয়া এক বিশেষ অনুভূতি। ছোটোবেলায় ঈদ খুঁজতাম চোখে, এখন খুঁজি মানুষের মুখের হাসিতে।"
শৈশবের সেই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের জায়গাটিতে এখন জমা হয়েছে এক নীরব নস্টালজিয়া আর এক টুকরো আত্মিক শান্তি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের জীবনে ঈদের গল্পগুলো আজ এভাবেই বিবর্তিত। কারও কাছে তা এখনো রঙিন, কারও কাছে স্মৃতির চাদরে মোড়ানো, আবার কারও কাছে তা শুধুই প্রিয় মানুষদের কাছে ফিরে যাওয়ার এক পরম আশ্রয়।