কিশোরগঞ্জে পানিতে ডুবে গেছে কৃষকের স্বপ্ন
বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা ইটনা,মিঠামইন, অষ্টগ্ৰামের হাওর এখন পানির নিচে। ধানের জমির পাশাপাশি হাওরের রাস্তাগুলোও পানিতে তলিয়ে গেছে। পানির নিচে কিছু পঁচা ধানের জমি ছাড়া পানির উপরে কোন জমি নেই। এখনো মিঠামইন ও অষ্টগ্ৰামের বিভিন্ন হাওরে প্রায় ৫০ একর জমি পানির নিচে রয়েছে। এসকল জমি অধিকাংশ বর্গা চাষি কৃষকদের। এই ২ দিনের বৃষ্টিতে এখন আর কাটার সম্ভবনা নেই। রবিবার সকাল থেকে আজ সোমবার দিনভর হাওরে বৃষ্টি এবং বাতাস বয়ে চলেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা চরম বিপাকে রয়েছে। যেসকল কৃষক বর্গা চাষি হিসেবে জমি করেছিলেন তারা এখন পাগল প্রায় । ঋন করে জমি রাখা , জমি চাষ করা, সব টাকাই মহাজনের ঋনের উপর ভরসা করে জমি করেছিলেন। আশা ছিল ভালো ফলন হবে, ধান বিক্রি করে মহাজনের ঋন শোধ করবে সারা বছরের খোড়াক জোগাড় করবেন। কিন্তু স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেলো । কৃষকরা অনেক আশা নিয়ে জমি চাষ করেছিলেন। এখন সব স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার। এ বছর কোরবানি ঈদে নেই কোন আনন্দ ।, বড়, ছোট, ও মাঝারি কৃষকরা অধিকাংশ ক্ষতির তালিকায়। তারা ঈদ করবে না,কি ব্যাংক ঋন, বিভিন্ন এনজিওর ঋন , মহাজনের ঋন শোধ করবে এ চিন্তায় অস্থির। যেসকল কৃষকের ঘরে গরু রয়েছে তারা পানির দামে গরু বিক্রি করছে । হাওরে গো- খাদ্যের তীব্র সংকট টান এলাকার বেপারিরা বাড়ি বাড়ি এসে গরু , হাস , কম মুল্যে ক্রয় করছে । কারন গরুর খাবারের সংকট অন্য দিকে হাঁসের খামারিরা হাঁসের খাবারের জন্য ধান চাষ করছিলো । সবই এখন পানির নিচে এর জন্য কৃষকরা ও এসব গবাদি পশু কম মূল্যে বিক্রি করছে । মিঠামইনের ঘাগড়ার শরিফ ঠাকুর নামে একজন আদর্শ কৃষক তিনি বলেন, মিঠামইনের বেরি বিলে ১ একর ৫০ শতাংশ ও কড়কইরা বিলে ৫০ শতাংশ জমি করেছেন। তার ৬ টি গরু রয়েছে। তিনি খুব আক্ষেপ করে বলেন "২ দিনের মেঘে যে ক্ষেতগুলো ভাসা অছিন হেই ক্ষেত অহন কমর পানির তলে গেছে গা, আর আশা নাই । গরুর ও খাওন নাই গরু বেইচ্চা নিজে খামু না ঋন দিমু" । তিনি ১ মুট ধান ও ঘরে তুলতে পারেননি। প্রতিদিন স্থানীয় বাজারে গাভীর দুধ বিক্রি করতেন। এখন গরু বিক্রি করে দিবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। অপর কৃষক মামুন মিয়া ফোরদিঘা হাওরে ৫০ শতাংশ জমি করেছিলেন। তিনি বলেন, ১ শতাংশ জমি কাটতাম পারছি না। আমার ক্ষেত অহনো ১ হাত পানির তলে। আমার ৫ টা গরু, গরুর ও বন নাই। ঈদের আগে বেইচ্চা ঋন দিমু, ডাহা যাওন ছাড়া কোন গতি নাই। অপর কৃষক আঙ্গুর মিয়া তিনি বাজারে ময়দা দিয়ে পিঠা বিক্রি করেন। তিনি বলেন,ঋন কইরা বেহির হাওরে ৩ খানি ক্ষেত করছিলাম সব ক্ষেত পানির তলে। ১ খের ক্ষেত কাটছিলাম। হেইডাও ধান হুগানির অভাবে নষ্ট হইছে। খোড়াকির লাগি ধান সিদ্ধ করছিলাম। হুগাইতাম পারছি না মেঘের লাগি । অহন দেশ ছাড়ন ছাড়া কোন উপায় নাই। বাহি ক্ষেত অহনো পানির তলে। ঋন দিবার ও ক্ষমতা নাই । ঈদ আইছে পুলাপাইনরে কি বুঝ দিমু । অপর কৃষক ডালিম মিয়া জানান, নৌপোষা ও সিনাই বিলে ৭ খানি জমি করছিলাম, কিছু কাইট্টা আইন্না ধান সিদ্ধ দিছলাম। বাহি ক্ষেত পানির তলে। এই ক্ষেতের আর আশা নাই। ঘাগড়া গ্ৰামের কৃষক রুবেল মিয়া জানান, সে বেরি, চ্প্টা, সিনাইবিল ও কাশিদ্দাপুড়া হাওরে ১০ একর জমি করছিলেন। অর্ধেক ক্ষেত কাডার পর বাহি ক্ষেত আস্তে আস্তে পানির তলে গেছে গা মেশিন ও যায় না দাওয়াল ও পাই না। দাওয়াল পাইলেও আড়াই হাজার টেহা খানি চাই । পঁচা ধান আইন্না কি করমু । ২ দিনের বৃষ্টিতে হেই ক্ষেত এহন কোমর পানির তলে। বাজারে দোহানদারি কইরা এই ক্ষেত গুলি করছিলাম। অহন নিজেও শেষ মুদি দোহান ও শেষ। এইরকম ছোট,বড় অনেক কৃষক রয়েছে এ হাওরে তাদের অর্ধেক জমি পানিতে তলিয়ে রয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ প্রকৃত কৃষকের নাম ক্ষতিগ্রস্তের তালিকায় নেই। অনেক নেতারা তাদের আত্মীয় স্বজনের নাম তালিকায় দিয়েছেন বলে পূর্ব অষ্টগ্রামের কৃষক মনু মিয়া অভিযোগ করেছেন। তিনি বড় হাওরের কৃষক। তার জমি পানির নিচে অথচ তার নাম নেই। হাওরের কৃষকরা জানান, যেসকল জমি এখনো পানিতে তলিয়ে রয়েছে এগুলো আর কাটা যাবে না। মাছের খাবার হয়েছে। এগুলো পানির নিচ থেকে কেটে আনলে গরুও খাবে না জ্বালানির কাজেও ব্যবহার করা যাবে না। অনেক কৃষকের হাওরে পাতি হাঁসের খামার রয়েছে। তারা জানান, এসকল হাঁস পালনের জন্য তারা ধানের জমি করে থাকেন। কিন্তু এবছর ধান পানির নিচে থাকায় হাঁস ও পানির দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। হাঁসের একমাত্র খাবার বর্ষাকালে ধান । মিটামইন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওবায়দুল ইসলাম অপু জানান, হাওরে ধান কাটা প্রায় শেষ। এখন যে গুলো পানিতে সামান্য পরিমানে তলিয়ে রয়েছে সেগুলো এখন আর কাটা সম্ভব নয়। শ্রমিক ও নেই হারভেস্টার ও নেই। এরকম জমির সংখ্যা একেবারে কম আবহাওয়া ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা যাচাই বাছাই করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সহযোগিতায় তালিকা ভুক্ত হচ্ছে। তালিকা প্রনয়নে কোন অনিয়ম হয়নি।