কটিয়াদীতে দুই শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা শুরু, উৎসবের আমেজে মুখর মসূয়া
সরকার রফিকুল ইসলাম আরমান, নিজস্ব প্রতিবেদক :
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলা উপজেলার মসূয়া গ্রামে শত বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে আবারও শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা। বাংলা সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য ও গ্রামীণ জীবনধারার এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হওয়া এ মেলাকে ঘিরে পুরো এলাকাজুড়ে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।
উপজেলার মসূয়া গ্রাম এলাকায় বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়-এর পৈত্রিক বাড়ির সামনের মাঠে প্রতিবছরের ধারাবাহিকতায় এবারও বসেছে এ ঐতিহাসিক বৈশাখী মেলা। প্রায় দুইশো বছরের পুরনো এ মেলা গত বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলেও মঙ্গলবার সকাল থেকেই মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। তিন দিনব্যাপী আনুষ্ঠানিক আয়োজন থাকলেও মেলার রেশ সাধারণত সপ্তাহজুড়েই চলতে থাকে।
সরেজমিনে দেখা যায়, মেলার নির্ধারিত মাঠ ইতোমধ্যেই ছোট-বড় শতাধিক দোকানে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ব্যবসায়ীরা কয়েকদিন আগেই এসে দোকান সাজাতে শুরু করেছেন। কেউ পসরা নিয়ে বসেছেন, আবার কেউ শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
মেলায় মাটির তৈরি পুতুল, হাড়ি-পাতিল, বাঁশ ও কাঠের তৈজসপত্র, খেলনা, কসমেটিকস, গৃহস্থালির সামগ্রীসহ নানা ধরনের দোকান বসেছে। শিশু-কিশোরদের আনন্দ দিতে রয়েছে নাগরদোলা, চরকি ও বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থা। নির্ধারিত জায়গা সংকুলান না হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ীকে আশপাশের জমিতেও দোকান বসাতে দেখা গেছে।
এ বছর উপজেলা প্রশাসনের ইজারায় মেলার রাজস্ব আদায় হয়েছে ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, যা গত বছরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। গত বছর এ মেলার ইজারা মূল্য ছিল ৭১ হাজার ৭০০ টাকা। স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন পর মেলার পরিধি ও আয়োজন এত বড় আকারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
মেলায় আগত দূরদূরান্তের দর্শনার্থীদের জন্য উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে একটি আধুনিক রেস্টহাউজ ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে বলেও জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী-এর পূর্বপুরুষ জমিদার হরি কিশোর রায় চৌধুরীর সময় থেকেই শ্রী শ্রী কালভৈরবী পূজাকে কেন্দ্র করে এ মেলার প্রচলন শুরু হয়। এলাকায় “রায় বাড়ি” নামে পরিচিত ঐতিহাসিক এ বাড়িটিই বর্তমানে মেলার মূল কেন্দ্রস্থল।
এই বাড়িতেই ১৮৬০ সালে জন্মগ্রহণ করেন প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং ১৮৮৭ সালে জন্ম নেন বিখ্যাত ছড়াকার সুকুমার রায়। দেশ বিভাগের পূর্বে পরিবারটি কলকাতায় চলে গেলে উত্তরাধিকার না থাকায় বাড়িটি বর্তমানে সরকারের রাজস্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। সম্প্রতি বাড়ির ধ্বংসপ্রাপ্ত অংশ ও পুকুরঘাট সংস্কার করায় এর সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
মেলা আয়োজক কমিটির সদস্য ও স্থানীয় বিএনপি নেতা বিল্লাল হোসেন বলেন, “এটি জেলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী মেলা। এবারের আয়োজনকে আরও আকর্ষণীয় ও সুশৃঙ্খল করতে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছি। একটি কমিটির মাধ্যমে পুরো মেলা পরিচালিত হচ্ছে।”
এ বিষয়ে কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, “মেলাকে ঘিরে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য ইজারাদারকে একটি পরিচালনা কমিটি গঠনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠে কাজ করছে।”
ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও লোকজ আনন্দের সমন্বয়ে কটিয়াদীর এ বৈশাখী মেলা এখন শুধু একটি স্থানীয় উৎসব নয়, বরং পুরো জেলার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।