বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬
বিশেষ প্রতিবেদন

“জন্ম না দিয়েও তিনি আজ প্রায় দুই হাজার পথশিশুর মা”

Admin ১০ May ২০২৬ · Sunday · ০৩:৫২ অপরাহ্ণ
“জন্ম না দিয়েও তিনি আজ প্রায় দুই হাজার পথশিশুর মা”
সাহেলা খান রিমুর জীবন সংগ্রাম, ভালোবাসা আর মানবতার গল্প

মাসুদ মাহাতাব, ঢাকা

রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা।
কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুমিয়ে আছে কয়েকজন শিশু। কারও গায়ে ছেঁড়া কাপড়, কেউ না খেয়েই ক্লান্ত শরীর নিয়ে পড়ে আছে মাটিতে। স্টেশনের বাতাসে তখনও ভেসে আসছে মানুষের ব্যস্ততা, ট্রেনের শব্দ আর একরাশ নির্লিপ্ততা।

ঠিক সেই সময় ছোট্ট এক মেয়ে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে এক নারীকে। কাঁপা কণ্ঠে বলে ওঠে
“মা… তুমি আজ আসছো তো?”

নারীটি শিশুটিকে বুকে টেনে নেন। চোখের কোণে জমে ওঠে পানি।
তিনি সাহেলা খান রিমু।
জন্ম না দিয়েও যিনি আজ প্রায় দুই হাজার পথশিশুর মা।

ঢাকার সবুজবাগে জন্ম ও বেড়ে ওঠা সাহেলা খান রিমুর। বাবা আব্দুর রাশেদ খান ও মা সাদেকা খাতুনের স্নেহে বেড়ে ওঠা এই সাহেদা খান রিমু ছোটবেলা থেকেই ছিলেন স্বপ্নবাজ। অন্যদের মতো শুধু নিজের ভবিষ্যৎ নয়, তিনি ভাবতেন সমাজের অবহেলিত শিশুদের নিয়েও।

ছোটবেলায় তিনি প্রায়ই ভাবতেন
একদিন এমন একটি স্কুল গড়বেন, যেখানে শিশুরা শুধু বইয়ের শিক্ষা নয়, মানুষ হওয়ার শিক্ষাও পাবে।

পড়াশোনা করেছেন Moniza Rahman Girls' School & College এবং পরে Government Shaheed Suhrawardy College-এ। স্কুল জীবন থেকেই শিশুদের নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা তাকে তাড়িয়ে বেড়াতো।

সেই স্বপ্ন থেকেই ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন “Dhaka Central Model School”। পরে গড়ে তোলেন “Dhaka City Model School”। ধীরে ধীরে প্রায় এক হাজার পরিবারের শিশুদের নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি।

কিন্তু তখনও তিনি জানতেন না, সামনে তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন, সবচেয়ে আবেগময় অধ্যায় অপেক্ষা করছে।

২০২০ সাল।
করোনায় থমকে যায় পুরো পৃথিবী।
বন্ধ হয়ে যায় স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত। মানুষ যখন ঘরের ভেতর নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই সাহেলা খান রিমু দেখলেন ভিন্ন এক বাংলাদেশ।

স্টেশনের পাশে ক্ষুধার্ত শিশু।
ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা কিশোর।
কেউ হারিয়েছে পরিবার, কেউ না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে, কেউ আবার বাধ্য হয়ে নেমেছে রাস্তায়।

এই দৃশ্য তাকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেয়।

তিনি বলেন,“আমি ঘরে বসে থাকতে পারিনি। বারবার মনে হচ্ছিল, এই শিশুগুলোর পাশে যদি কেউ না দাঁড়ায়, তাহলে ওরা কোথায় যাবে?”

১৫ জুন ২০২০।
সেদিন থেকেই শুরু হয় তার নতুন জীবন।

শুরুতে হয়তো ছিল হাতে গোনা কয়েকজন শিশু। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সংখ্যা বাড়তে থাকে। একসময় পথশিশুরাই হয়ে ওঠে তার পৃথিবী, তার পরিবার, তার বেঁচে থাকার কারণ।

আজ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার পথশিশুর মুখে তিনি শুনেছেন পৃথিবীর সবচেয়ে আবেগময় শব্দ
“মা”।

এই একটি ডাকই যেন তার সমস্ত ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।

তিনি বলেন,“অনেক রাত আমি ঘুমাতে পারিনি শুধু একটা শিশুর কান্না ভেবে। নিজের কষ্ট ভুলে ওদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছি। কারণ আমি জানি, ক্ষুধা কত ভয়ংকর।”

তার এই দীর্ঘ পথচলায় অসংখ্য গল্প জমে আছে। তবে সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দিয়েছিল ছোট্ট “সাথী”-র গল্প।

একদিন কমলাপুর স্টেশনের পাশে তিনি দেখতে পান এলোমেলো চুল, ময়লা জামা পরা ছোট্ট একটি মেয়েকে। ভীত চোখে মানুষের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। কাছে যেতেই মেয়েটি তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল
“মা, আমাকে ফেলে যেও না…”

সেদিন জানতে পারেন, সাথী পরিবার থেকে হারিয়ে রাস্তায় চলে এসেছে।

এরপর শুরু হয় খোঁজাখুঁজি।
দিনের পর দিন চেষ্টা চালিয়ে অবশেষে সাথীকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হন সাহেলা খান রিমু।

সেদিনের দৃশ্য এখনও ভুলতে পারেন না তিনি।

সাথীর মা যখন মেয়েকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে কান্না করছিলেন, তখন রিমুর চোখেও অশ্রু ঝরছিল।

তিনি বুঝেছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখ হয়তো কাউকে তার আপন ঠিকানায় ফিরিয়ে দেওয়ার মাঝেই লুকিয়ে আছে।

আজ মা দিবসে পথশিশুরা যখন তাকে ঘিরে ধরে “মা” বলে ডাকে, তখন আবেগে ভেঙে পড়েন সাহেলা খান রিমু।

কারণ, জন্ম না দিয়েও তিনি আজ প্রায় দুই হাজার সন্তানের মা।

তিনি কোনো পুরস্কার চান না।
কোনো সম্মাননা চান না।

তার ভাষায়,“পথশিশুদের মুখে শোনা ‘মা’ ডাকটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন, সবচেয়ে বড় অ্যাওয়ার্ড।”

এই শহরের ব্যস্ততার ভিড়ে, স্বার্থ আর প্রতিযোগিতার পৃথিবীতে সাহেলা খান রিমু যেন এক টুকরো মানবতার নাম।
যিনি প্রমাণ করেছেন মা হওয়া শুধু জন্ম দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়,মা হওয়া মানে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, আশ্রয় আর নিরাপত্তার আরেক নাম।

মা দিবসে পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি রইলো গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।
যেসব মা সন্তানকে জন্ম দিয়ে আগলে রাখেন, আর যেসব মা জন্ম না দিয়েও ভালোবাসা, মমতা ও আশ্রয় দিয়ে অসংখ্য শিশুর জীবন আলোকিত করেন সকল মায়ের প্রতি রইলো বিনম্র শ্রদ্ধা

মন্তব্য

এখনও কোনো মন্তব্য নেই।

আরও পড়ুন

কিশোরগঞ্জে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ভেজাল খাদ্যপণ্য ধ্বংস

কিশোরগঞ্জে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ভেজাল খাদ্যপণ্য ধ্বংস

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় শাহাব উদ্দিন ফুড প্রডাক্টস নামক একটি প্রতিষ্ঠানে...

২৬ October ২০২৬ · Monday · ০২:৫৪ অপরাহ্ণ
মারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কামরুল ইসলামের নির্বাচনি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

মারিয়া ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী কামরুল ইসলামের নির্বাচনি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নের বিন্নাগ...

২৫ October ২০২৬ · Sunday · ০৫:২৫ অপরাহ্ণ
ছোট ভাই আলমগীরই হত্যা করায় বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরকে,সংবাদ সম্মেলনে দাবি নিহতের স্ত্রীর

ছোট ভাই আলমগীরই হত্যা করায় বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীরকে,সংবাদ সম্মেলনে দাবি নিহতের স্ত্রীর

বিজয় কর রতন,কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আল...

২৪ October ২০২৬ · Saturday · ০৯:০০ অপরাহ্ণ
মিঠামইনে বিএনপির সভাপতি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা

মিঠামইনে বিএনপির সভাপতি হত্যার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা

বিজয় কর রতন, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার বিএনপির সভাপতি এডভোকেট জাহি...

২৪ October ২০২৬ · Saturday · ০৮:০৫ অপরাহ্ণ