তিন যুগের অপেক্ষা: একটি সেতুর অভাবে বন্দি হোসেনপুরের সাহেবের চর
সঞ্জিত চন্দ্র শীল,হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার সাহেবের চর গ্রাম। চারদিকে সবুজ ফসলের মাঠ, ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা খাল আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে চাপা পড়ে আছে হাজারো মানুষের দীর্ঘশ্বাস, অবহেলা আর টিকে থাকার কঠিন সংগ্রাম।
মাত্র একটি ছোট সেতুর অভাবে গত তিন যুগ ধরে দুর্বিষহ জীবন পার করছেন গ্রামের প্রায় তিন হাজার বাসিন্দা।
যাতায়াতের একমাত্র পথে বুকসমান পানি
সাহেবের চর থেকে মূল সড়কে যাওয়ার একমাত্র পথটি গেছে ব্রহ্মপুত্রের শাখা খালের ওপর দিয়ে। এই পথেই কৃষককে যেতে হয় মাঠে, শিক্ষার্থীদের যেতে হয় স্কুল-কলেজে, রোগীকে যেতে হয় হাসপাতালে।
কিন্তু খালটি পুনঃখননের পর বছরের আট থেকে নয় মাসই পানিতে ডুবে থাকে চলাচলের পথ। রাস্তা নেই, সেতু নেই। আছে শুধু বুকসমান পানি আর প্রতিদিনের মৃত্যুঝুঁকি।
প্রায় ৫০০ একর আবাদি জমিতে যেতে প্রতিদিন চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় কৃষকদের। কাঁধে লাঙ্গল, হাতে বীজ, সঙ্গে গরু-ছাগল নিয়ে পানির মধ্য দিয়ে পার হতে গিয়ে যেন প্রতিদিন যুদ্ধ করতে হয় তাদের। কখনো কাদায় পড়ে নষ্ট হয় ফসল, কখনো পানিতে পড়ে আহত হন কৃষক।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক চিত্র স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের। জামা-কাপড় ভিজিয়ে, বইখাতা মাথায় তুলে প্রতিদিন পার হতে হয় এই খাল। অনেক সময় ভিজে বই নষ্ট হয়। বর্ষায় পানি বাড়লে অনেক শিক্ষার্থী স্কুলে যাওয়াই বন্ধ করে দেয়। স্রোতের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের স্বপ্নও।
স্থানীয় গ্রামবাসী জয়নাল মিয়া (৬৫) বলেন, “ছোটবেলা থেইকা এই কষ্ট দেইখা আসতেছি। কত চেয়ারম্যান মেম্বার আইলো, সেতুর কথা কইলো, কিন্তু আজও কিছুই হইলো না। বর্ষা আইলেই আমরা বন্দি হইয়া যাই।”
কৃষক শফিকুল ইসলাম (৫০) বলেন, “মাঠ থেইকা ফসল আনতেই জান শেষ হইয়া যায়। পানিতে পড়ে ধান নষ্ট হয়। পোলাপান স্কুলে যাইতে ডরায়। একটা ছোট সেতুর জন্য আর কত বছর অপেক্ষা করুম?”
এলাকাবাসীর অভিযোগ, নির্বাচন এলেই জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাসের শেষ থাকে না। সেতু হবে, কাজ শুরু হবে, বরাদ্দ এসেছে, এমন প্রতিশ্রুতি শোনা যায় প্রতিবারই। কিন্তু ভোট শেষ হলে প্রতিশ্রুতিও ডুবে যায় খালের পানিতে।
বহুবার পত্রিকার পাতায় ও টেলিভিশনের পর্দায় উঠে এসেছে সাহেবের চরের মানুষের এই সীমাহীন দুর্ভোগের চিত্র। সংবাদ হয়েছে, প্রতিবেদন হয়েছে, ক্যামেরায় ধরা পড়েছে মানুষের কান্না। তবুও টনক নড়েনি সংশ্লিষ্টদের।
আজও একটি ছোট সেতুর অপেক্ষায় দিন গুনছে পুরো গ্রাম। বিকল্প হিসেবে গ্রামবাসী নিজেদের উদ্যোগে একটি বাঁশের সাঁকো তৈরি করেছে। কিন্তু সেটিও অত্যন্ত নড়বড়ে ও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। ভয় আর আতঙ্ক নিয়েই চলাচল করছে শিশু, বৃদ্ধসহ হাজারো মানুষ।
সাহেবের চরবাসীর প্রশ্ন, স্বাধীনতার এত বছর পরও কি একটি ছোট সেতু পাওয়ার অধিকার নেই তাদের? কত কষ্ট, কত কান্না, কত দুর্ভোগ দেখলে জাগবে দায়িত্বশীলদের বিবেক?
গ্রামবাসীর একটাই দাবি: অবিলম্বে খালের ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা হোক। যাতে কৃষক বাঁচে, শিক্ষার্থীরা নিরাপদে স্কুলে যেতে পারে, আর একটি গ্রামের তিন যুগের কান্নার অবসান হয়।