কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলের কৃষকদের কাটা ধান পানিতে ভাসছে-চারদিকে কান্নার আওয়াজ
বিজয় কর রতন,হাওর অঞ্চল প্রতিনিধি: প্রবল বর্ষণ ও অতি মাত্রায় বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টির কারনে বাড়ির আঙিনায় আধা পাকা কাটা ধান এখন পানিতে ভাসছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে রাত ব্যাপী ঝড় বৃষ্টি বজ্রপাত আতংকে বাড়ীর পাশে ধানের খলায় রক্ষিত ধান সরাতে পারেনি। বুধবার ভোরে অধিকাংশ খলায় ধান ভেসে যাচ্ছে। রাতের বেলায় প্রায় কৃষকের ঘরে কান্নার আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। কষ্টের ফসল এমনি ভাবে ভেসে যাওয়াটা সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি । মিঠামইন, ইটনা, অষ্টগ্রাম সহ তিন উপজেলায় কৃষকদের দাবি প্রায় ১৫ হাজার মন ধান বাড়ির আঙ্গিনায় পানিতে ভাসছে । এসকল ধান পচন ধরেছে । কৃষকরা সংরক্ষণ করতে পারেনি ধান শুকানোর মতো ব্যবস্থা নেই। মিঠামইনের ঘাগড়া গ্ৰামের কৃষক ধন মিয়া মেম্বার বলেন, তার ধানের খলায় ৫ শতাধিক মন ধান পানিতে ভাসছে। এছাড়াও বর্তমানে ১২ একর জমি ফুরদিঘার হাওরে পানিতে তলিয়ে গেছে। অন্যদিকে ঘাগড়া মসজিদের ইমাম মোঃ কামরুল হুদার বামন কোনা হাওরে ২০ একর জমি পানির নিচে। তার বাড়ির আঙিনায় খলায় প্রায় ৪ শত মন ধান পানিতে ভাসছে সে জানায়, খাল খনন না থাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে এখন এসকল ধান পানিতে ভাসছে। পানি নামার কোন ব্যবস্থা নেই। এমন অনেক কৃষকের ধান তাদের চোখের সামনে পানিতে ভেসে যাচ্ছে। কিছুই করার নেই। কৃষকরা শুধু বিলাপ করছে । একই ইউনিয়নের মালিউন্দ গ্ৰামের কৃষক মোঃ হারিছ মিয়ার খলায় ১ শত মন ধান পানিতে ভেসে গেছে। তার শিংরাকান্দা হাওরে ৫ একর জমি পানির নিচে। একই গ্ৰামের অপর কৃষক আলাই মিয়া সে ৫ একর জমি করছেন এই হাওরে সে জমির ধান ও পানির নিচে পচন ধরেছে । ফুল মিয়া নামে অপর কৃষক চপ্টা, বেসুরকোনা , ও ফুরদিঘার হাওরে ৩৫ একর জমি বোরো ধান চাষ করেছেন বর্তমানে ১ হাজার মন ধান খলায় পানিতে পচন ধরেছে এরকম আরো ২ শতাধিক কৃষক রয়েছে। তাদের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। মিঠামইন উপজেলায় প্রায় ৫ হাজার মন ধানের জমি বর্তমানে পানির নিচে। পানি না নামলে এসকল জমিতে পচন ধরবে । কোন কোন কৃষক ধান বিক্রির চেষ্টা করলে ভেজা ধান ৪-৫ শত টাকা মন বেপারিরা কিনছেন। মিঠামইনের অধিকাংশ কৃষক মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা এনে জমি জিরাত করেছেন। এ অবস্থা চলতে থাকলে হাওরের কৃষক ধংস হয়ে যাবে ।যেসকল কৃষক বর্গা চাষি হিসেবে জমি করেছেন তারা সর্বশান্ত হয়ে পড়েছেন। কারন তলিয়ে যাওয়া জমি থেকে এক মুঠ ধান ও ঘরে তুলতে পারেননি। তারা সর্বশান্ত হয়ে পড়েছে । তাদের ঘরে প্রতি রাতেই কান্নার শব্দ শুনা যায়। অন্যদিকে উঁচু জায়গায় কিছু আধা পাকা ধান থাকলেও প্রতি একর জমি মেশিনে কাটলে ১০- ১২ হাজার টাকা গুনতে হয়। কৃষকরা হিসাব মিলাতে পারছে না। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খলাপাড়া হাঁটুরিয়া নদীর তীরে দেওরাইল, চিরুন , কোনিদিঘার হাওরে কৃষকরা ১০ ভাগ জমি ও কাটতে পারেনি। যেকোনো সময় নদীর তীরবর্তী বাধ ভেঙ্গে এসকল জমি তলিয়ে যেতে পারে। বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকরা অভিযোগ করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধে ফাটল ধরেছে । কাজের মান খারাপ হওয়ায় জমির পাশ থেকে মাটি কেটে বাধ নির্মাণ করেছে বাঁধের মাটি ধসে জমিতে পড়ছে । গত দুইদিনের বৃষ্টিতে অধিকাংশ পাকা ও কাঁচা সড়ক একদিকে পানি অন্যদিকে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। হাওরে ধান বহনকারী ট্রাক বন্ধ হয়ে গেছে। ডিজেলের চড়া মূল্যের কারনে হারভেস্টার মালিকরা তাদের রেইট বাড়িয়ে দিয়েছে। মিঠামইনে কৃষকদের দাবি ৪০ % ধান কাটা হয়েছে। এর মধ্যে ২০ % ধান খলায় পানিতে ভাসছে। কোন কোন জায়গায় দেশি শ্রমিকরা নয়নভাগায় পানির নিচ থেকে ধান কাটছে। এসকল ধান নৌকায় তুলে বাড়ি নিয়ে আসছে । কোন কোন জায়গায় ধানের দামের চেয়ে নৌকার ভাড়া বেশি । হাওরে অধিকাংশ কৃষকের ধানের খলায় কোমর পানি । কাঁচা ধান কাটলেও পানি বৃদ্ধির কারণে ধান সংরক্ষণ করতে পারছে না কৃষকরা। ঘাগড়া গ্ৰামের তোফাজ্জল মিয়া জানান, ধান পানির নিচ থেকে কেটে লাভ নেই কারণ রাখার মতো জায়গা নেই ক্ষেতের ধান ক্ষেতেই নষ্ট হয়ে পড়ে থাকুক। তিনি আরো বলেন, ১ লক্ষ টাকা মহাজনের কাছ থেকে ঋণ এনে ৫ একর জমি চাষ করেছিলাম। তিনি একজন কাঁচামাল ব্যবসায়ী। তিনি আরো জানান, ব্যবসা ও শেষ করলাম ধান ও পাইলাম না পুলাপাইন লইয়া সারাবছর কেমনে চলমু । ঋনের টেহা দিমু কই থেইকা। ক্ষেতের আশা ছাইড়া দিয়া আবার কাঁচামালের ব্যবসায় নাইমা যামু । মিঠামইন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, উবায়দুল ইসলাম অপু জানান,মিঠামইনে এ বছর ১৫ হাজার ৭ শত ৩০ হেক্টর জমি আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতি হয়েছে ১৬ শত ৭৫ হেক্টর। এখন পর্যন্ত ৪৯ % ধান কাটা হয়েছে। মোট ৪ শত ২৮ হেক্টর। আমরা কৃষি কর্মকর্তার দপ্তর থেকে দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিয়েছি । আকাশের অবস্থা একটু ভালো হলে দ্রুত ধান কেটে ফেলা যাবে । প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমাদের কোন হাত নেই।