লোডশেডিং-জ্বালানি সংকটে চিংড়ি শিল্পে চরম বিপর্যয়,ক্ষতির মুখে ব্যবসা-শিক্ষা ও জনজীবন
মো: আল-মাহফুজ শাওন
জ্বালানি সংকট ও ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে খুলনার হিমায়িত চিংড়ি শিল্পে চরম বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। উৎপাদন ধরে রাখতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেল কিনতে হচ্ছে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে, ফলে বাড়ছে লোকসান ও অনিশ্চয়তা। একইসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও এসএসসি পরীক্ষার্থীরা।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, একটি ফ্যাক্টরিতে ২৪ ঘণ্টায় যেখানে বিদ্যুৎ বিল আসতো প্রায় ২৯ হাজার টাকা, সেখানে মাত্র ৭ ঘণ্টা ৪০ মিনিট লোডশেডিং সামাল দিতে জেনারেটরের জন্য ডিজেল কিনতে হয়েছে ৫৫ হাজার ৩১৫ টাকার। এতে একদিনেই ৩০ হাজার টাকার বেশি ভর্তুকি গুনতে হয়েছে।
সাউদার্ণ ফুডস লিঃ-এর এজিএম মো. মিজানুর রহমান বলেন, “গত বুধবার ৫ দফায় ৭ ঘণ্টা ৪০ মিনিট লোডশেডিং হয়েছে। ফ্যাক্টরি চালু রাখতে ৬৩ হাজার ৮৫০ টাকার ডিজেল কিনতে হয়েছে।”
রূপসার ইলাইপুরে অবস্থিত ফ্রেশ ফুডস লিঃ কর্তৃপক্ষ জানায়, মৌসুম পুরোপুরি শুরু না হলেও সব বিভাগ চালু রাখতে হচ্ছে। দুই শতাধিক শ্রমিক-কর্মচারীর এই প্রতিষ্ঠানে লোডশেডিংয়ের কারণে কার্যত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। প্রতি ঘণ্টায় জেনারেটর চালাতে প্রায় ৭৫ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হচ্ছে।
রূপসার রোজেমকো ফুডস লিঃ-এর পরিচালক সেলিম রেজা ও ব্যবস্থাপক নাজমুল হুদা চৌধুরী জানান, তাদের ৫টি হিমাগারে প্রায় ৩৫ কোটি টাকার মাছ সংরক্ষিত রয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় তা ঝুঁকির মুখে। তারা বলেন, “এক ঘণ্টায় যেখানে বিদ্যুৎ বিল সাড়ে ৪ হাজার টাকা, সেখানে ডিজেলে খরচ হচ্ছে ২৩ হাজার টাকা—অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৮ হাজার ৫শ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।”
তারা চিংড়ি শিল্পকে গার্মেন্টসের মতো অগ্রাধিকার খাতে অন্তর্ভুক্ত করে সরাসরি ডিপো থেকে সহজ শর্তে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
এদিকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। খুলনা হার্ডমেটাল গ্যালারির হৃদয় ইলেকট্রনিক্সের টিএসএম মো. আনোয়ার জাহিদ বলেন, “সন্ধ্যার পর ক্রেতা আসা শুরু করতেই দোকান বন্ধ করতে হয়। বিক্রি প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে।”
লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা জানায়, পড়তে বসার পরপরই বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। তীব্র গরম ও অন্ধকারে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় ফিডারভিত্তিক লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় ৭৫৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৬১৯ মেগাওয়াট, ঘাটতি ১৮২ মেগাওয়াট। দুপুর ১টায় ৮০১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৬৪৩ মেগাওয়াট, ঘাটতি ছিল ১৫৮ মেগাওয়াট।
প্রতিদিন গড়ে ৬-৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। রাতের গভীর সময়েও বিদ্যুৎ না থাকায় ঘুমহীন রাত কাটাতে হচ্ছে নগরবাসীকে।